পশ্চিমবঙ্গে নথিপত্রহীন অভিবাসীদের ভয়ে সীমান্তে মানবিক সংকট
পশ্চিমবঙ্গে অভিবাসীদের ভয়ে সীমান্তে মানবিক সংকট

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নবগঠিত রাজ্য সরকার নথিপত্রবিহীন অভিবাসীদের বিরুদ্ধে যেকোনো মুহূর্তে একটি বড় ধরনের সাঁড়াশি অভিযান শুরু করতে পারে—এমন চরম আশঙ্কায় শত শত মানুষ এখন বাংলাদেশ সীমান্তে এসে জড়ো হয়েছেন। রাজ্যের হাকিমপুর সীমান্তচৌকিতে বিগত দুই দিন ধরে নারী, শিশু ও পরিবারসহ বহু মানুষ এক অনিশ্চিত অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছেন। তাদের মনে তীব্র ভয় জেঁকে বসেছে যে, ভারতে অবস্থান করলে তাদের যেকোনো সময় গ্রেপ্তার করে ডিটেনশন সেন্টারে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। ফলে নিজেদের সুরক্ষার্থে অনেকেই এখন যেকোনো উপায়ে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে চাইছেন।

রাজনৈতিক পটভূমি ও নতুন সরকারের পদক্ষেপ

চলতি মে মাসের শুরুর দিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কট্টর হিন্দুত্ববাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আরোহন করে। ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই তারা রাজ্যে বসবাসরত নথিপত্রহীন অভিবাসীদের প্রথমে ‘শনাক্তকরণ’ এবং পরবর্তীতে তালিকা থেকে বাদ দিয়ে বহিষ্কার বা নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি দেয়। নতুন সরকারের এমন কঠোর বার্তার পরপরই গোটা সীমান্ত এলাকায় নজিরবিহীন কড়াকড়ি ও নজরদারি শুরু হয়। ফলশ্রুতিতে নথিপত্রবিহীন সাধারণ অভিবাসীদের মধ্যে রাতারাতি তীব্র উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

মানবাধিকার সংস্থার বিশ্লেষণ

বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে, মূলত আইনি সুরক্ষার চরম অভাব এবং জোরপূর্বক মাতৃভূমি থেকে বিতাড়িত হওয়ার গভীর ভয় থেকেই সীমান্তে এই মানবিক সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে এই বিশাল জনগোষ্ঠী এক অদ্ভুত ও নির্মম দোটানার মধ্যে পড়েছেন। একদিকে ভারত ছাড়ার জন্য স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের ওপর প্রতিনিয়ত মনস্তাত্ত্বিক ও প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে; অন্যদিকে নাগরিকত্বের কোনো আনুষ্ঠানিক বা আইনি প্রমাণ ছাড়া বাংলাদেশ সরকার তাদের গ্রহণ করবে না—এমন কঠিন নিয়মের বেড়াজালে আটকা পড়েছেন তারা।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অবৈধভাবে সীমান্ত পারাপারের চেষ্টা

এই চরম অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে উপায়ান্তর না দেখে অনেক পরিবারই এখন রাতের অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে সীমান্তের নদী পথ ব্যবহার করে অবৈধভাবে বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টা চালাচ্ছেন। তবে এভাবে নদী সাঁতরে বা নৌকাযোগে কতজন মানুষ ইতিমধ্যে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পেরেছেন, তার সঠিক সংখ্যা এখনো প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

ডিটেনশন সেন্টার নির্মাণের নির্দেশ

পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নেয় যখন গত সপ্তাহে পশ্চিমবঙ্গ সরকার নথিপত্রহীন অভিবাসীদের (যাঁদের মধ্যে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা উভয় জনগোষ্ঠীই রয়েছে বলে ভারতের দাবি) সাময়িকভাবে আটকে রাখার জন্য একটি বড় আটক কেন্দ্র বা ডিটেনশন সেন্টার নির্মাণের আনুষ্ঠানিক নির্দেশ জারি করে। এই প্রশাসনিক পদক্ষেপের পর রাজ্যের প্রায় সাড়ে তিন কোটি মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে সামগ্রিক উদ্বেগ আরও বহুগুণ বেড়ে গেছে।

ভুক্তভোগীদের কণ্ঠস্বর

এমনই একজন ভুক্তভোগী ৪৫ বছর বয়সী হাসিনা বিবি, যিনি প্রায় ছয় বছর আগে কাজের সন্ধানে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন এবং তখন থেকে কলকাতার একটি নির্মাণাধীন ভবনে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছিলেন। নিজের বর্তমান দুর্দশার কথা জানিয়ে হাসিনা বিবি বলেন, ‘আমাদের দ্রুত ভারত ছেড়ে চলে যেতে বলা হয়েছে, অন্যথায় সরকার আমাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেবে। কেবল জীবিকার তাগিদে এই শহরে এসেছিলাম, এখন বাধ্য হয়ে বাংলাদেশে ফিরে যেতে চাই। কিন্তু জানি না সীমান্তে বা ওপারে আমাদের ভাগ্যে আসলে কী অপেক্ষা করছে।’

কলকাতা থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত ভারতের এই হাকিমপুর সীমান্ত দিয়ে সহজেই বাংলাদেশের দিনাজপুরের হাকিমপুর সীমান্ত এলাকায় প্রবেশ করা সম্ভব—এমন একটি খবর হঠাৎ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এরপরই কলকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী জেলাগুলো থেকে শত শত দিশেহারা মানুষ দল বেঁধে এই সীমান্ত এলাকায় এসে জড়ো হতে শুরু করেন।

সীমান্তের উন্মুক্ত এলাকা ও অর্থনৈতিক কারণ

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্তের বেশ কিছু দুর্গম জায়গা এখনো পুরোপুরি উন্মুক্ত রয়ে গেছে। মূলত চরম অর্থনৈতিক সংকট, কর্মসংস্থান ও সীমান্তের ওপারে থাকা পারিবারিক সম্পর্কের সূত্র ধরেই বহু মানুষ বিভিন্ন সময়ে ভারতে প্রবেশ করেছেন। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের মতো সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে এই নথিপত্রহীন অভিবাসীরা দীর্ঘদিন ধরে সস্তা শ্রমশক্তির একটি বড় অংশ হিসেবে অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন।

জাতিগত ও ধর্মীয় প্রোফাইলিংয়ের অভিযোগ

তবে মানবাধিকারকর্মীদের গুরুতর অভিযোগ, গত কয়েক মাসে কোনো প্রকার আইনি প্রক্রিয়ার তোয়াক্কা না করে, কেবল জাতিগত ও ধর্মীয় প্রোফাইলিংয়ের (মুসলমান) ভিত্তিতে আসাম থেকে শত শত মানুষকে জোরপূর্বক সীমান্ত এলাকায় এনে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে উত্তর ২৪ পরগনা জেলার তেঁতুলিয়া গ্রামে একটি ডিটেনশন সেন্টার কড়া পুলিশি পাহারায় রাখা হয়েছে। সেখানে নথিপত্রহীন এবং অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশের অভিযোগে আটক হওয়া অভিবাসীদের বাংলাদেশে পুশব্যাক বা ফেরত পাঠানোর আগে পরিচয় যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সাময়িকভাবে রাখা হচ্ছে। আসামের এই ভয়াবহ পুশব্যাকের অভিজ্ঞতার কারণেই মূলত এবার পশ্চিমবঙ্গে বসবাসরত মানুষের আতঙ্ক আরও প্রকট ও দৃশ্যমান রূপ নিয়েছে।

পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্য

সীমান্তে দায়িত্বরত পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সুব্রত সাহা আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপিকে জানিয়েছেন, গত মঙ্গলবার থেকেই মানুষ হাকিমপুর সীমান্তে দল বেঁধে আসতে শুরু করেছেন। এখানে অস্থায়ী আশ্রয়ে জড়ো হওয়া মানুষদের সুরক্ষার স্বার্থে প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ের জন্য প্রথমে আটক কেন্দ্রে নেওয়া হবে এবং পরবর্তীতে বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের (বিএসএফ) কাছে হস্তান্তর করে নিয়ম অনুযায়ী বাংলাদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে।

দীর্ঘদিনের অভিবাসন সমস্যা

বাস্তবতা হলো, অভিবাসন ও নাগরিকত্ব নিয়ে বাংলাদেশ-ভারতের এই দ্বিপাক্ষিক সমস্যাটি একেবারেই নতুন নয়। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ রাজত্বের অধীনে ভারত বিভাগের পর থেকেই এই ভৌগোলিক অঞ্চলে অভিবাসনের এক দীর্ঘ ও জটিল ইতিহাস রয়েছে। তবে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাধ্য হয়ে ফিরে আসার এই আকুল চেষ্টা অনেকের সামনেই নিজেদের পরিচয় এবং অস্তিত্বের এক বিরাট সংকট তৈরি করেছে।

তরুণ আব্দুল শেখের কাহিনী

২০ বছর বয়সী তরুণ আব্দুল শেখ নিজের ক্ষোভ ও অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন, ‘আমার মা-বাবা প্রায় দুই দশক আগে বাংলাদেশ থেকে ভারতে এসেছিলেন। আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা এই কলকাতাতেই, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমার কাছে ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণ করার মতো কোনো বৈধ নথিপত্র নেই। মা-বাবাও আজ বেঁচে নেই, আর এখন আমাকে দেশ ছাড়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। আমি বুঝতে পারছি না, ওপারে বাংলাদেশে গিয়ে কীভাবে প্রমাণ করব যে আমি একজন প্রকৃত বাংলাদেশি!’

অনুরূপ এক পরিস্থিতির শিকার আরিফুল সরদার নামের এক রাজমিস্ত্রি, যিনি তিন বছর আগে তার অসুস্থ বাবার চিকিৎসার করানোর উদ্দেশ্যে বৈধ-অবৈধ উপায়ে ভারতে গিয়েছিলেন। তিনি অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে বলেন, ‘আমরা আসলে ভীষণ অসহায়, কেবল সরকারি আদেশের ভয়ে ও আটকের হাত থেকে বাঁচতেই আমরা সব ফেলে দেশে ফিরে যাচ্ছি।’

সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সতর্কবার্তা

এদিকে সীমান্তরক্ষী বাহিনী সতর্কবার্তা জারি করে জানিয়েছে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে রাতের আঁধারে সীমান্ত পারাপারের চেষ্টা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। অনেকেই ভৌগোলিক সুযোগ নিয়ে সীমান্তের কাছাকাছি নদী দিয়ে পার হওয়ার চেষ্টা করছেন। বিএসএফের একজন কর্মকর্তা এএফপিকে স্পষ্ট করে বলেন, বর্ষা বা অন্য সময়ে নদী পার হওয়া খুব একটা কঠিন কাজ নয়। তাই রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকারে দীর্ঘ নদীপথ জুড়ে মানুষের এই অনুপ্রবেশ ঠেকানো সীমান্তরক্ষীদের জন্য এখন অত্যন্ত কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে।