কাতারের শাহানিয়া এলাকায় রোববার সকালে একটি পিকআপ ভ্যান দুর্ঘটনায় ছয়জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে পাঁচজনের বাড়ি সিলেটের কানাইঘাট উপজেলায়। নিহতরা হলেন জিবাল আহমদ (৩৬), জসিম উদ্দিন (৩০), মোস্তাক আহমদ (৩০), জুবায়ের আহমদ (৩০) ও কাদির আহমদ (২৪)।
জিবাল আহমদ: সাত মাস বয়সী ছেলেকে কোলে নেওয়া হলো না
জিবাল আহমদের সাত মাস বয়সী ছেলে তালহা আহমদের জন্ম হয়েছিল বাবার বিদেশে থাকা অবস্থায়। কাতারে বসে প্রতিদিন ভিডিও কলে ছেলেকে দেখতেন তিনি। ফোনের পর্দায় ছেলেকে ডাকতেন, আদর করতে চাইতেন। স্বজনদের বলতেন, দেশে ফিরে ছেলেকে কোলে নেবেন। কিন্তু সেই ইচ্ছা আর পূরণ হলো না।
রোববার সন্ধ্যায় সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার আমরপুর গ্রামে জিবাল আহমদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শোকে স্তব্ধ পরিবার। টিনের লম্বা ঘরের দুটি কক্ষে থাকেন তাঁর মা, স্ত্রী ও পাঁচ সন্তান। অন্য কক্ষে থাকে জিবালের দুই ভাইয়ের পরিবার। বাড়ির চারপাশে কাদাপানি। ঘরের বারান্দায় স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভিড়। ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসছিল স্ত্রী ও মায়ের আহাজারি।
জিবালের ১৪ বছর বয়সী ছেলে পারভেজ আহমদ প্রায় নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে ছিল। বাবার কথা জানতে চাইলে সে বলে, ‘শনিবার রাইতে আব্বার লগে মাত অইছিল। তাইন জিগাইছলা, কিতা করো?’ এরপর আর কথা বলতে পারেনি সে। একপর্যায়ে ঘরে গিয়ে সাত মাস বয়সী ছোট ভাই তালহাকে কোলে নিয়ে বাইরে আসে পারভেজ। পরিবারে তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে তৃতীয় পারভেজ। ছেলেদের মধ্যে বড় হিসেবে এখন সংসারের দায়িত্ব যেন তার কাঁধেই এসে পড়েছে।
স্বজনেরা বলেন, অভাবের কারণে কয়েক মাস আগে কানাইঘাটের গাছবাড়ি বাজারের একটি কাপড়ের দোকানে কাজ নিয়েছিল পারভেজ। মাসখানেক আগে সে কাজ ছেড়ে দেয়।
জিবালের স্ত্রী বুশরা বেগম বিলাপ করে বলেন, ‘ছোট বাইচ্চাইন ঘরো, তারারে লইয়া কিলা-খিতা করতাম...আল্লাহ।’ জিবালের মা সিরাজুন্নেছা বলেন, ছেলে প্রায় দেড় বছর আগে ছুটিতে দেশে এসেছিলেন। ছোট নাতিকে জন্মের পর ছেলে কোলে নিতে পারেননি, সে কথা বলে বিলাপ করছিলেন।
জিবালের ভগ্নিপতি আবদুল খালিক বলেন, রোববার দুপুরে কাতারপ্রবাসী এক স্বজন ফোন করে মৃত্যুর খবর দেন। পরিবারে উপার্জনক্ষম আর কেউ নেই। শিশু ও কিশোর সন্তানদের নিয়ে পরিবারটি এখন অসহায় অবস্থায় পড়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা প্রয়োজন।
জসিম উদ্দিন: ঋণের বোঝা মাথায় নিয়েই মৃত্যু
একই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন কানাইঘাট উপজেলার আগতালুক গ্রামের জসিম উদ্দিন (৩০)। প্রায় সাত বছর ধরে কাতারে ছিলেন তিনি। তিন বছর আগে দেশে এসে নিজের সঞ্চয় ও ঋণের টাকায় আধা পাকা একটি ঘর করেন। ছুটি শেষে কাতারে ফিরে গিয়ে মাসে মাসে সেই ঋণের কিস্তি শোধ করছিলেন। কিন্তু ঋণের বোঝা মাথায় নিয়েই তাঁর মৃত্যু হলো।
রোববার রাতে জসিম উদ্দিনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পাশাপাশি দুটি বাড়ির একটিতে তাঁর পরিবার বসবাস করে। ঘরে আছেন বৃদ্ধ মা, স্ত্রী ও দুই সন্তান। ঘরের ভেতরে দেয়ালে ঝুলছিল জসিম উদ্দিনের বিয়ের ছবি। বিছানায় বসে সেই ছবির দিকে তাকিয়ে ছিলেন তাঁর শ্বশুর আলাউদ্দিন। বারান্দায় বসে ছিল ১০ বছর বয়সী ছেলে তানিম আহমদ ও ৬ বছর বয়সী মেয়ে মেহেরিন বেগম। বাবার সঙ্গে তাদের স্মৃতি বলতে দেশে আসার সময়গুলো আর প্রতিদিনের মুঠোফোনে কথা বলা। বাবা যে আর কখনো ফিরবেন না, সেটি তারা এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি।
জসিমের বোন উমামা বেগম বলেন, ‘ভাই ঋণ নিয়ে ঘর করছিল। এখনো প্রায় দুই লাখ টাকার ঋণ বাকি। এখন সেই ঋণ কে শোধ করবে আর দুইটা ছোট বাচ্চা নিয়ে সংসার কেমনে চলবে, সেটাই চিন্তা। আমাদের চাওয়া, সরকার যেন দ্রুত মরদেহ দেশে আনার ব্যবস্থা করে এবং অসহায় পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ায়।’
অন্যান্য নিহত ও পরিবারের অবস্থা
দুর্ঘটনায় নিহত অন্য তিনজন হলেন কানাইঘাট উপজেলার ঝিঙ্গাবাড়ী ইউনিয়নের মাঝতালুক গ্রামের মোস্তাক আহমদ (৩০), জুবায়ের আহমদ (৩০) এবং দক্ষিণ বাণীগ্রাম ইউনিয়নের গাছবাড়ি নয়াগ্রামের কাদির আহমদ (২৪)। তাদের পরিবারেও নেমে এসেছে শোকের ছায়া। পরিবারগুলো সরকারের কাছে দ্রুত মরদেহ দেশে আনার এবং আর্থিক সহায়তার আবেদন জানিয়েছে।



