ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর ইরান যুদ্ধ: বাইবেলীয় ভবিষ্যদ্বাণী ও আর্মাগেডনের রাজনীতি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের সাম্প্রতিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সংঘাতকে তারা কেবল ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখছেন না, বরং বাইবেলীয় ভবিষ্যদ্বাণীর দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সামরিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
হোয়াইট হাউসের বিশেষ প্রার্থনা ও ধর্মীয় অনুষঙ্গ
২০২৬ সালের ৫ মার্চ বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে একটি অস্বাভাবিক দৃশ্যের অবতারণা হয়েছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ধ্যানী ভঙ্গিতে বসে আছেন, তাঁর পেছনে ২০ জন ধর্মযাজক ও ধর্মীয় নেতা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে। তাঁরা সম্মিলিতভাবে প্রার্থনা করছেন ইরান যুদ্ধে মার্কিন বাহিনীর বিজয় ও ট্রাম্পের সুরক্ষার জন্য। এই দৃশ্য মুঘল সম্রাট আকবরের যুদ্ধপূর্ব প্রার্থনার কল্পিত চিত্রের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, তবে বাস্তবতা ভিন্ন।
হোয়াইট হাউসের 'ফেইথ অফিস'-এর প্রধান পলা হোয়াইটের উদ্যোগে এই আয়োজন করা হয়। উপস্থিত ছিলেন ক্রাইস্ট ফেলোশিপ চার্চের প্রতিষ্ঠাতা প্যাস্টর টম মিউলিন্স, ক্যালিফোর্নিয়ার মেগা চার্চের প্যাস্টর গ্রেগ লরি, প্যাস্টর জেন্টেজেন ফ্র্যাঙ্কলিন ও ইভানজেলিক্যাল নেতা জনি মুরের মতো প্রভাবশালী ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব। মার্কিন ইতিহাসে যুদ্ধে জয় কামনায় হোয়াইট হাউসে এ ধরনের সম্মিলিত প্রার্থনার কোনো নজির নেই।
প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ক্রুসেড তত্ত্ব ও ইসলামবিদ্বেষ
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সিবিএস নিউজের 'সিক্সটি মিনিটস' অনুষ্ঠানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, ইরান যুদ্ধে ঈশ্বর আমেরিকার পক্ষে আছেন। তিনি দাবি করেন, আমেরিকা একটি ধর্মীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়ছে, যারা বাইবেলের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী আর্মাগেডন বা চূড়ান্ত মহাযুদ্ধ ঘটানোর লক্ষ্যে পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে। হেগসেথের বক্তব্যে ধর্মীয় যুদ্ধের ইঙ্গিত স্পষ্ট।
প্রতিরক্ষামন্ত্রীর শরীরে 'কাফের' শব্দের আরবি ট্যাটু ও ক্রুসেডারদের 'ডিউস ভুল্ট' স্লোগানের উলকি ইসলামবিদ্বেষের পরিচয় দেয়। তাঁর লেখা 'আমেরিকান ক্রুসেড' বইয়ে ইসলাম ও বামপন্থাকে পশ্চিমা সভ্যতার জন্য হুমকি হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। হেগসেথ একাদশ শতকের ক্রুসেডের অকুণ্ঠ প্রশংসা করেন এবং একুশ শতকের ক্রুসেডের必要性 তুলে ধরেন।
ইসরায়েলের 'গ্রেটার ইসরায়েল' পরিকল্পনা ও ধর্মীয় দাবি
ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি টাকার কার্লসনের সঙ্গে আলাপচারিতায় মন্তব্য করেন, পুরো মধ্যপ্রাচ্য ইসরায়েলের দখলে আসা উচিত, কারণ তিন হাজার বছর আগে ঈশ্বর এই ভূমি ইহুদিদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বাইবেলের জেনেসিস ১৫:১৮ শ্লোক অনুযায়ী, নীল নদ থেকে ইউফ্রেটিস নদী পর্যন্ত এলাকা ইহুদিদের জন্য নির্ধারিত।
ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্সের সেনাদের পোশাকে 'গ্রেটার ইসরায়েল'-এর মানচিত্র খচিত ব্যাজ এই পরিকল্পনারই প্রতিফলন। নেতানিয়াহু ২০২৬ সালের ১৩ মার্চ ভাষণে দাবি করেন, 'আমরা সেই রাজ্য প্রতিষ্ঠা করব এবং মসিহর আসা নিশ্চিত করব।' ইহুদি ধর্মমতে, মসিহর আগমনের জন্য সোলাইমানি মন্দির পুনর্নির্মাণ আবশ্যক, যা আল-আকসা মসজিদের স্থানে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
ইভানজেলিক্যাল খ্রিষ্টান ও জায়নবাদীদের অদ্ভুত মৈত্রী
ইভানজেলিক্যাল খ্রিষ্টানরা যিশুর পুনরাগমনের সাতটি শর্তে বিশ্বাস করে, যার মধ্যে ইহুদিদের ইসরায়েলে পুনরাগমন, জেরুজালেমে ইহুদি নিয়ন্ত্রণ, থার্ড টেম্পল নির্মাণ ও আর্মাগেডনের যুদ্ধ অন্তর্ভুক্ত। এই শর্ত পূরণে ইসরায়েলি জায়নবাদ অপরিহার্য ভূমিকা রাখে বলে তাদের ধারণা। তাই ইভানজেলিক্যালরা ইসরায়েলের পক্ষে অবস্থান নেয়, যদিও তাদের বিশ্বাসমতে ইহুদিদের মসিহ আসলে অ্যান্টিক্রাইস্ট বা দাজ্জাল।
ট্রাম্প ইভানজেলিক্যাল ভোটারদের ৮০ শতাংশের সমর্থন পান, কারণ তাঁরা মনে করেন ট্রাম্প ঈশ্বরের মনোনীত নেতা এবং তিনি আর্মাগেডনের যুদ্ধ ত্বরান্বিত করে যিশুর পুনরাগমন নিশ্চিত করছেন। জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া ও দূতাবাস স্থানান্তর এই বিশ্বাসেরই প্রতিফলন।
পিটার থিয়েলের অ্যান্টিক্রাইস্ট বক্তৃতা ও বিশ্বব্যবস্থা
সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তি ধনকুবের পিটার থিয়েল ভ্যাটিকানের নিকটে রুদ্ধদ্বার সভায় অ্যান্টিক্রাইস্ট বা দাজ্জালের আগমন নিয়ে ধারাবাহিক বক্তৃতা দিচ্ছেন। তাঁর মতে, কোনো অ্যান্টিক্রাইস্ট-সদৃশ ব্যক্তি পারমাণবিক যুদ্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা জলবায়ু বিপর্যয়ের ভয় দেখিয়ে 'ওয়ান ওয়ার্ল্ড অর্ডার' বা একক বিশ্বব্যবস্থা চাপিয়ে দিতে পারে। থিয়েলের বিশ্লেষণে বাইবেলীয় আর্মাগেডনের সঙ্গে বর্তমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়।
উপসংহার: ধর্মীয় ভবিষ্যদ্বাণীর রাজনৈতিক ব্যবহার
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর সরকার ইরান সংঘাতকে বাইবেলীয় আর্মাগেডনের প্রেক্ষাপট হিসেবে উপস্থাপন করছেন। হোয়াইট হাউসের প্রার্থনা, প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ক্রুসেড তত্ত্ব, 'গ্রেটার ইসরায়েল' ধারণা ও ইভানজেলিক্যাল-জায়নবাদী মৈত্রী এই কৌশলের অংশ। ধর্মীয় ভবিষ্যদ্বাণীকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে তারা আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায় ও নৈতিক বৈধতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন। এই প্রবণতা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে আরও জটিল ও অনিশ্চিত করে তুলছে, যেখানে ধর্মীয় বিশ্বাস ও রাজনৈতিক স্বার্থ অদ্ভুতভাবে মিশে গেছে।
