ক্ষমতার হাতবদলের ইতিহাস
দেশে দেশে শাসক ও সরকার পরিবর্তন নতুন কিছু নয়, আদিকাল থেকেই হয়ে আসছে। প্রাচীন গ্রিসে কোথাও রাজা আবার কোথাও মুষ্টিমেয় বুদ্ধিজীবী রাজ্য চালাতেন। যখনই তাঁদের বিরুদ্ধে অসন্তোষ দেখা দিত, নতুন রাজা বা নতুন বুদ্ধিজীবীরা এসে ক্ষমতা দখল করতেন।
কোথাও কোথাও এখনো রাজতন্ত্র আছে। তবে পুরোনো রাজারা যে হারে বিদায় হচ্ছেন, সেই তুলনায় নতুন রাজা আসছেন না। মিসরের সাবেক রাজা ফারুককে যখন বিদায় নিতে হয়েছিল, তখন তিনি বলেছিলেন, বিশ্বে শেষ পর্যন্ত মাত্র পাঁচজন রাজা অবশিষ্ট থাকবেন—তাসের চার রাজা এবং ইংল্যান্ডের রাজা।
নির্বাচনের প্রকারভেদ ও সীমাবদ্ধতা
আধুনিক সময়ে যেখানে রাজতন্ত্র নেই, সেই সব দেশে নির্বাচনকে সরকার পরিবর্তনের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ পদ্ধতি হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু নির্বাচনের অনেক প্রকারভেদ আছে। রাজনীতিবিদেরা নিজেদের সুবিধার জন্য অনেক কিসিমের নির্বাচন উদ্ভাবন করেছেন। যেমন আনুপাতিক হারে নির্বাচন, মৌলিক নির্বাচন, রাতের নির্বাচন, তুমি-আমি নির্বাচন, হ্যাঁ-না নির্বাচন, বিরোধীদের বাদ দিয়ে নির্বাচন।
তা ছাড়া কয়টা নির্বাচনই বা সুষ্ঠু হয়? অনুন্নত দেশগুলোতে অনেক সময় জনগণের এত ধৈর্য থাকে না যে পরের নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করবে, তার আগেই শুরু হয় সরকার পরিবর্তনের তোড়জোড়।
সেনাবাহিনীর ভূমিকা
একসময় দেশে সরকার পরিবর্তন হতো সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখল বা মার্শাল লর মাধ্যমে। দেশে অসন্তোষ দেখা দিলে কিংবা উপযুক্ত সুযোগ থাকলে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করত। আমাদের দেশেও অনেকবার মার্শাল ল হয়েছে। সেনাশাসকেরা কিছুদিন দেশকে শান্ত রাখেন। তারপর তাঁরাও রাজনীতিতে ঢুকে সিস্টেমের অংশ হয়ে যেতেন।
আন্দোলনের মাধ্যমে পরিবর্তন
মার্শাল লর কার্যকারিতা নিয়ে মানুষের এখন আর উৎসাহ নেই। তাই বলে শাসকেরা নিশ্চিন্ত থাকতে পারছেন না। এখন স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে যখন অসন্তোষ দেখা দেয়, আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে হটিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। সাধারণত আন্দোলন শুরু করে ছাত্র ও তরুণেরা। তবে আন্দোলন যে সব সময় সফল হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। জনসমর্থন এবং আন্দোলনের ধার একটা ‘সর্বোচ্চ সীমায়’ না নিতে পারলে আন্দোলন সফল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। আরেকটি ফ্যাক্টর হলো শাসকদের দমননীতি, সেটা যত ধারালো হবে জনগণের রোষ এবং অংশগ্রহণ তত বাড়বে।
জেন-জি ও তেলাপোকা আন্দোলনের উত্থান
আগে জেন-জি, তেলাপোকা এমন বাহারি নাম ছিল না। কিন্তু ছাত্র ও তরুণেরাই সব সময় আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকত। তবে জেন-জিদের সঙ্গে আগেকার তরুণদের পার্থক্য হলো, আগে আন্দোলনকারী তরুণেরা নিজেরা ক্ষমতার ভাগ চাইত না। তারা আন্দোলনের সফলতা তুলে দিত রাজনীতিবিদদের হাতে।
এখন জেন-জি, তেলাপোকাদের যুগ। তারা শুধু ক্ষমতা পরিবর্তনে অবদান রেখে খুশি নয়, তারা ক্ষমতা ভোগ করতে চায় এবং দেশের পরিবর্তনে নিজেদের প্রত্যক্ষ অবদান রাখতে চায়।
ইন্টারনেট যুগে জেন-জি সফলতার একটা বড় কারণ হলো, খুব কম সময়ে তারা বিপুল সমর্থকদের সংঘবদ্ধ করতে পারে। বাংলাদেশের জেন-জি জুলাই আন্দোলন গড়তে সময় নিয়েছিল সম্ভবত দুই সপ্তাহ। ভারতীয় তেলাপোকার খবর ছড়িয়েছে গত তিন-চার মাসে, এর মধ্যে বিপুল সাড়া মিলেছে। কিন্তু গতানুগতিক রাজনৈতিক দলগুলো যেমন তাদের কর্মীদের দীর্ঘ সময় ধরে রাখতে পারে, জেন-জিরা তা পারে না। তারা সম্ভবত একটা মাইলস্টোন পার হলেই সমর্থক হারায়।
জেন-জি আন্দোলনের সাফল্য ও ব্যর্থতা
যে কয়টি দেশে পরিবর্তন এসেছে, তাতে মনে হচ্ছে জেন-জিরা সরকারে পরিবর্তন এনে যতটুকু বাহবা কুড়িয়েছে, সরকারে গিয়ে পরিবর্তন আনতে ততটুকু সফল হয়নি। প্রতিটি দেশে তার ভিন্ন ভিন্ন কারণ রয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় কারণ হলো অভিজ্ঞতার অভাব। দেশের শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন চাওয়া এক কথা, কিন্তু পরিবর্তন ঘটিয়ে সফল করা এক বিশাল দায়িত্ব।
বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলনকারীরা আমাদের চোখের সামনেই একটা সরকার পরিবর্তন করেছে এবং জনগণের অভূতপূর্ব সমর্থন পেয়েছে। তারা একটা অন্তর্বর্তী সরকার বসিয়ে দেশের আমূল পরিবর্তন করতে চেয়েছিল। তাদের সেই চাওয়া যে অপূর্ণই থেকে গেল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আমাদের জেন-জিদের ব্যর্থতা নিয়ে খুব বেশি পর্যালোচনা হয়নি, যা হয়েছে তাও খুব খণ্ডিত।
আমি শুধু দু–চারটি বিষয় তুলে ধরতে পারি। আমাদের জুলাই আন্দোলনকারী ছাত্রনেতারা প্রথম থেকেই নিজেদের রাজনৈতিক আদর্শ দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। যদিও তাঁরা একটা বড় কোয়ালিশন গঠন করে হাসিনা সরকারকে বিতাড়িত করতে পেরেছেন, কিন্তু আন্দোলন সফল হওয়ার পরেই তাঁরা নিজেদের ক্ষুদ্র রাজনৈতিক ইচ্ছাগুলোকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। তাঁদের সেই ইচ্ছাগুলো কখনো মবের আকারে ধরা পড়েছে, কখনো বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, আবার কখনোবা দেশের পরিবর্তনের চেয়ে নিজেদের রাজনৈতিক ক্ষমতা বিস্তারে দৃশ্যমান হয়েছে। তাতে করে আমার মনে হয় আন্দোলনের পিউরিটি বা বিশুদ্ধতা জুলাই আন্দোলনকারীরা আস্তে আস্তে হারিয়ে ফেলে।
এই ব্যাপারে তরুণদের ডাকে যাঁরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অভিভাবকের দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তাঁদের বিরাট দায়িত্ব ছিল, তরুণদের নির্দেশনা বা গাইডেন্স দেওয়ার। কিন্তু সেটা হয়ে ওঠেনি। অভিভাবকেরাই গড্ডালিকা প্রবাহে ভেসেছিলেন। ফলে বিগত জাতীয় নির্বাচনের আগেই জুলাই আন্দোলনকারীরা দারুণভাবে হোঁচট খেয়েছেন এবং বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়েছিলেন। তাঁদের বড় একটা অংশ জামায়াতের সঙ্গে হাত মিলিয়ে রাজনীতিতে টিকে আছে।
আমাদের জেন-জিরা আন্দোলন–পরবর্তী পদক্ষেপগুলো ঠিকভাবে নিতে পারেনি এটা সত্য, কিন্তু এটাও সত্য—তাঁদের আন্দোলন আমাদের দেশ থেকে একদলীয় শাসনব্যবস্থার জগদ্দল পাথর সরিয়েছে এবং গণতান্ত্রিক সংস্কারে উত্তরণে আমাদের আকাঙ্ক্ষাকে এখনো জিইয়ে রেখেছে। এটা আমাদের জেন-জিদের কম সাফল্য নয়!
ভারতে তেলাপোকা আন্দোলন
জেন-জি আন্দোলনের আরেক ধারা অঙ্কুরিত হয়েছে ভারতে, যাকে বলা হচ্ছে তেলাপোকা আন্দোলন। যদিও এই আন্দোলনের সবেমাত্র শুরু এবং এই আন্দোলন কতটুকু এগোবে তা এখনো নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে একটা বিষয় বোধ হয় বলা যেতে পারে, ভারতে এই ধরনের আন্দোলন সফল হওয়ার চ্যালেঞ্জগুলো আরও বেশি।
সম্প্রতি তেলাপোকারা তাদের রাজনৈতিক দল গঠন করেছে, নাম দিয়েছে ‘তেলাপোকা জনতা পার্টি’, যার মূলমন্ত্র—‘একতা, সহনশীল ও অপ্রতিরোধ্য’। ভারতে কেউ কেউ তাদের বলছে, ‘একঝলক নির্মল বাতাস’, কারও কাছে এটা ‘কৌতুকের খোরাক’।
ভারতে একটা পপুলিস্ট বা জনপ্রিয় আন্দোলন বেশ কয়েক বছর আগে শুরু হয়েছে—সেটা হলো ‘হিন্দুত্ববাদী’ আন্দোলন, যার ওপর ভর করে ভারতের হিন্দু গরিষ্ঠ জনগণের সমর্থন নিয়ে নরেন্দ্র মোদির বিজেপি অনেক বছর ধরে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারে ক্ষমতাসীন রয়েছে। এমনকি এই ধর্মীয় রাজনৈতিক পরিচিতি ভারতের রাজ্যগুলোর স্থানীয় পরিচিতিকে হারিয়ে দিয়েছে। সর্বশেষ উদাহরণ পশ্চিমবঙ্গে। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির সঙ্গে তেলাপোকাদের যে সংঘাত হবে তাতে কার জয় হবে, সেটা এখনই বলা সম্ভব নয়।
তবে ভারতে ধর্মীয় রাজনীতির জাগরণকে পরাজিত করা তেলাপোকাদের পক্ষেও সহজ হবে না। ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ পরিচিতি, ভারতীয় জাতীয়তাবাদের অগ্রদূত জাতীয় কংগ্রেস সবই ধর্মীয় পরিচয়ের কাছে পরাজয় স্বীকার করেছে। তেলাপোকা জনতা পার্টি কি পারবে ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) হারিয়ে ভারতের বুকে সংস্কার এবং সহনশীলতার রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত করতে?
সালেহ উদ্দিন আহমদ শিক্ষক, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। মতামত লেখকের নিজস্ব।



