সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের মধ্যেও নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি নিজের অবিচল আনুগত্য প্রকাশ করেছেন কৃষ্ণনগরের হাই প্রোফাইল সংসদ সদস্য (এমপি) মহুয়া মৈত্র। দলটির অনেক শীর্ষ নেতা ‘বিদ্রোহী’ শিবিরে যোগ দিলেও মহুয়া স্পষ্ট জানিয়েছেন, যতদিন রাজনীতিতে আছেন, ততদিন তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ছাড়বেন না। আর দল ছাড়া বিধায়কদের তিনি বিদ্রোহী নয়, গাদ্দার বলে মন্তব্য করেছেন। সম্প্রতি তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ ভাঙন ও সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি বাংলার শুভজ্যেতি ঘোষের সঙ্গে এক একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।
তৃণমূলের বিভক্তি নিয়ে মহুয়া মৈত্রের ব্যাখ্যা
সাক্ষাৎকারের শুরুতে উপস্থাপক জানতে চান, গত মাসখানেকের ভেতর তৃণমূল কংগ্রেসকে প্রায় তিন টুকরো হয়ে যেতে দেখা গেছে। মহুয়া মৈত্র আসলে কোন পক্ষের সঙ্গে আছেন? এর জবাবে কিছুটা সংশোধন এনে মহুয়া মৈত্র বলেন, ‘তৃণমূল কংগ্রেস মূল পার্টি যেটি, সেটি কোনোদিন বিভক্ত হয়নি ও হবে না। তিনি উল্লেখ করেন, এটি কংগ্রেস বা বিজেপির মতো বংশানুক্রমিক দল নয়; এটি সম্পূর্ণ নেত্রীকেন্দ্রিক ও কর্মীকেন্দ্রিক। এর নেত্রী একজনই, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি নিজে এই দল তৈরি করেছেন এবং প্রতীকও নিজের হাতে এঁকেছেন। ফলে যারা দলের প্রতীকে জিতে নিজের স্বার্থে অন্য পথ দেখছেন, তাকে দল ভাঙা বলা যায় না।
২০ এমপির এনডিএ সমর্থন ও বিধায়কদের বিভক্তি
তবে সংসদের ২০ জন এমপি যখন এনডিএকে সাপোর্ট করার কথা বলছেন এবং বিধায়কদের একটি অংশ নিজেদের আসল তৃণমূল দাবি করে আলাদা দল করার কথা বলছেন, তখন একে অনেকে ভেতর থেকে দল ভেঙে চৌচির হওয়া হিসেবে দেখছেন। এর ব্যাখ্যায় মহুয়া মৈত্র বলেন, পার্লামেন্টের যে ২০ জন এমপি এখন এনডিএকে সমর্থন করার কথা বলছেন, মানুষ ভোট দেওয়ার সময় কিন্তু তাদের ভোট দেওয়ার পাশাপাশি বিজেপি বা এনডিএকে বর্জন করেছিল। এরা প্রত্যেকেই দলের প্রায় ৭৫ লাখ টাকার তহবিল ব্যবহার করে জিতেছেন। মহুয়া মৈত্র অভিযোগ করেন, এই এমপিরা এখন ‘এনসিপিআই’ নামক যে দলের সঙ্গে একীভূত হওয়ার কথা বলছেন, তার কোনো রাজনৈতিক বা নৈতিক অস্তিত্ব নেই। এটি নির্বাচন কমিশন কর্তৃক অর্থপাচারে যুক্ত হিসেবে চিহ্নিত একটি অনিবন্ধিত দল, যার ফেসবুক পেজে ফলোয়ার মাত্র ৭৫ জন। তিনি আরও বলেন, শুভেন্দু অধিকারীর দল ছাড়ার পেছনে রাজনৈতিক ব্যাখ্যা থাকলেও, এই ২০ জনের ক্ষেত্রে কেবল লোভ বা ভয় কাজ করছে। এক মাস আগে যারা সংসদে মোদি-অমিত শাহের বিরুদ্ধে বলেছিলেন, আজ তারা কাজের অজুহাতে এনডিএ-কে সমর্থন করছেন—এটি কোনোভাবেই বিশ্বাসযোগ্য নয়।
কলকাতার বিধায়কদের সমালোচনা
অন্যদিকে কলকাতার বিধায়কদের প্রসঙ্গে তিনি কটাক্ষ করে বলেন, গত ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার ফলে নেতাদের চর্বি জমে গেছে এবং তাদের মধ্যে বিরোধী রাজনীতি করার দম নেই। তারা কেবল সুবিধাজনক অবস্থান থেকে নামতে চাইছেন না। দলের এই ভাঙনের পেছনে নেত্রীর কোনো দায় আছে কি না—জানতে চাইলে মহুয়া মৈত্র অকপটে স্বীকার করে বলেন, মমতাদি একজন ইমোশনাল এবং গণভিত্তিসম্পন্ন নেতা। গত ১৫ বছরে যারা পার্টিতে যোগ দিয়েছে, তারা ক্ষমতার রাজনীতি দেখে এসেছে। তারা দলের আসল রক্ত নয়, বরং ক্ষমতার লোভে এসেছে। যারা দলকে সামনে রেখে নিজের আখের গুছিয়েছে, তাদের একটু নিয়ন্ত্রণে আগে থেকেই রাখা উচিত ছিল। পাশাপাশি তিনি উল্লেখ করেন, নির্বাচনে প্রায় ৩০ লাখ বৈধ ভোটারকে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং অসম নির্বাচনি ময়দানের কারণে একে প্রকৃত মানুষের রায় বলা যায় না।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ ভণ্ডামি
বিদ্রোহীদের একাংশের অভিযোগ—অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঔদ্বত্য এবং আইপ্যাক-এর মতো করপোরেট কায়দায় দল চালানোই এই ভাঙনের কারণ। এই অভিযোগকে ভণ্ডামি আখ্যা দিয়ে মহুয়া বলেন, এরা প্রত্যেকে দেড় মাস আগেই অভিষেকের নেতৃত্বে এবং তৃণমূলের প্রতীকে নির্বাচন জিতেছে। তখন কেন এই কালচারের বিরোধিতা করেননি? আসলে টিকিট বা পরিবারের পদের সময় অভিষেককে দরকার হয়, আর আজ তিনি অভিশাপ হয়ে গেলেন! দলে আলোচনার জায়গা আছে, পছন্দ না হলে তারা অন্য দলে গিয়ে দাঁড়াতে পারতেন। পাপি হালদার বা ইউসুফ পাঠানদের মতো যারা তৃণমূলের টিকিটে জিতেছেন, তারা কেন গেলেন তার ব্যাখ্যা তাদেরই দিতে হবে।
সায়নী ঘোষের প্রস্থান 'শক' হিসেবে
মহুয়া মৈত্র বলেন, ২০ জনের মধ্যে সায়নী ঘোষের চলে যাওয়াটা আমার কাছে একটি ‘শক’ ছিল। দল তাকে খুব কম সময়ে যুব সভাপতির পদ থেকে শুরু করে যাদবপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ আসন এবং হেলিকপ্টারে করে পুরো বাংলায় প্রচারের সুযোগ দিয়েছে। দল যাকে এত কম সময়ে এত কিছু দিলো, তার এভাবে চলে যাওয়া তিনি ভাবতেও পারেননি। নিজের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে মহুয়া মৈত্র দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, আমি এদের বিদ্রোহী নয়, বরং গাদ্দার বলব। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিজের মায়ের মতো উল্লেখ করে তিনি জানান, কোনো সমস্যা থাকলে তিনি নেত্রীকেই বলবেন এবং তিনি দলেই আজীবন থাকবেন। রাজনীতিতে আবেগ না থাকলে তিনি কর্পোরেট সেক্টরে জেপি মরগানেই চাকরি করতেন।
কংগ্রেসের সঙ্গে জোট ও ভবিষ্যৎ
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি আবার কংগ্রেসে যোগ দিতে পারেন, এমন প্রশ্নের জবাবে মহুয়া মৈত্র বলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের শক্তিতে একা সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে তিনবার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন, যা ভারতের ইতিহাসে বিরল। তিনি কংগ্রেসে গিয়ে পার্টি একীভূত করবেন বলে মনে হয় না। তবে ২০২৯-এ বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য তৃণমূল এবং কংগ্রেসের জোট হবেই, এর কোনও বিকল্প নেই। গণতন্ত্র রক্ষার স্বার্থে বিরোধীদের একত্রিত হতেই হবে। পরিশেষে তিনি বলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাকে যে রাজনৈতিক পরিচয় দিয়েছেন সেজন্য তিনি চিরকৃতজ্ঞ এবং তিনি নেত্রীর সঙ্গেই থাকবেন।



