দুই বছর আগে বাংলাদেশের ইতিহাসে জুলাই এসেছিল প্রবলভাবে। তরুণদের দৃপ্ত পদচারণে ক্যাম্পাস আর রাজপথ হয়ে উঠেছিল মুখর। অনুঘটক ছিল ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’। আমরা প্রবেশ করলাম ইতিহাসের দীর্ঘতম জুলাইয়ে। এটি প্রবল বন্যায় ভাসিয়ে দিয়েছিল ক্ষমতাসীনদের।
জুলাইয়ের দুই চেহারা: গ্রাম বনাম নগর
প্রতিবছর আমরা গ্রীষ্মের গরমে হাঁসফাঁস করি। তারপর বৃষ্টি এলে আমাদের প্রাণ জুড়ায়। চাষিরা কেউ জমি থেকে পাট তোলার আয়োজন করেন, কেউ জমি তৈরি শুরু করেন আমন ধানের জন্য। বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এটি ব্যস্ততম মাসগুলোর একটি। নাগরিক জীবনে এর ছোঁয়া নেই। নগরে বৃষ্টিকে দেখা হয় নেতিবাচকভাবে। পত্রিকায় শিরোনাম হয়, টানা বৃষ্টি কিংবা ‘খারাপ’ আবহাওয়ার কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত। অফিসযাত্রীদের ভোগান্তি। একই দেশের দুই ছবি। গ্রামের কোটি কোটি কৃষকের অফিস হলো মাঠে। বৃষ্টি তাঁদের কাছে পরম আকাঙ্ক্ষার ধন। নগরে এটি উৎপাত।
জুলাইয়ের আন্তর্জাতিক দিবস ও বাংলাদেশের প্রাসঙ্গিকতা
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জুলাই নানা দিবসে ভরপুর। স্বাস্থ্য ও উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে ‘বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস’ (১১ জুলাই), তরুণসমাজকে দক্ষ ও কর্মঠ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ‘বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস’ (১৫ জুলাই), বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াই এবং বিশ্বশান্তি ও স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে ‘নেলসন ম্যান্ডেলা আন্তর্জাতিক দিবস’ (১৮ জুলাই), বিপন্ন প্রজাতির বাঘ ও তাদের আবাসস্থল সংরক্ষণের জন্য বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বাড়াতে ‘আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস’ (২৯ জুলাই) ইত্যাদি। এ দিবসগুলো আসে আর যায়। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও কিছু এনজিও এসব দিবস উপলক্ষে একই রকম টুপি আর টি-শার্ট পরে পদযাত্রা-সেমিনার করে। তারপর ভুলে যায়।
চব্বিশের জুলাই: জয়ী ও পরাজিতের গল্প
চব্বিশের জুলাইকে দেখা যায় নানান আঙ্গিকে, নানান দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মোটাদাগে দুটি জনগোষ্ঠী। একটি গোষ্ঠী মনে করে, তারা জয়ী হয়েছে। তাদের কাছে এটি গণ-অভ্যুত্থান বা বিপ্লব। অন্য গোষ্ঠী হেরে গেছে। তারা মনে করে, তারা এ ঘটনার ভিকটিম বা শিকার। তারা এর পেছনে দেখে ষড়যন্ত্র।
ষড়যন্ত্রতত্ত্বের মর্ম হলো, কিছু লোক বসে ফন্দি এঁটে সরকার হটিয়ে দিয়েছে। কারণ, দেশটা এতই উন্নতি করছিল যে এটি তাদের আর সহ্য হচ্ছিল না। তারা দেশের ‘ফেরেশতাতুল্য’ নেতাদের বিরুদ্ধে মানুষকে উসকে দিয়ে দেশের সর্বনাশ করে দিয়েছে। দেশের অনেক লোক এই তত্ত্ব বিশ্বাস করেন। তাঁরা মনে করেন, তাঁদের নেতা ছিলেন ‘ঈশ্বরতুল্য’। তাঁর কোনো ভুল হতে পারে না। তিনি কোনো ভুল করেননি। তাঁর চেয়ে বড় দেশপ্রেমিক এ দেশে আর নেই। দেশের যারা ভালো চায় না, সেই কুচক্রীরা বিদেশি শত্রুদের সঙ্গে সলাপরামর্শ করে সরকারের পতন ঘটিয়ে দিয়েছে। আমেরিকা এটি ঘটিয়ে দিয়েছে।
ষড়যন্ত্রতত্ত্বের পুরোনো ইতিহাস
ষড়যন্ত্রতত্ত্ব নতুন নয়। ১৯৭১ সালের কথা আমরা জানি। পাকিস্তান ভেঙে গেল। জন্ম হলো বাংলাদেশের। মাঝে অনেক রক্ত ঝরল। কেন এমন হলো? এখানেও আছে ষড়যন্ত্রতত্ত্ব। পাকিস্তান তো সোনার দেশ ছিল! দুধ আর মধুর নহর বয়ে চলত! পাকিস্তানের শত্রুদের এটি সহ্য হয়নি। সোভিয়েত ইউনিয়ন তার ভূরাজনৈতিক স্বার্থে ভারতকে দিয়ে পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ বানিয়ে দিয়েছে। দেশের মানুষ এটি চায়নি। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মানুষের কোনো ক্ষোভ ছিল না।
ষড়যন্ত্রতত্ত্ব অনেক পুরোনো। যারা হেরে যায়, তারা এটি আঁকড়ে নিজেদের ন্যায্যতা দিতে চায়। তারা নিজেদের কর্মকাণ্ডকে বলে ‘পরিকল্পনা’ আর ভিন্নমতের লোকদের কর্মকাণ্ডকে বলে ‘ষড়যন্ত্র’। দুটি একই জিনিস। কখনো কখনো একটা হেরে যায় অন্যটির কাছে। এভাবেই এগিয়ে যায় সমাজ, ইতিহাস।
কোটা সংস্কার আন্দোলনের সূত্রপাত
আসুন, আমরা দুই বছর আগের জুলাইয়ের দিনগুলোর দিকে ফিরে তাকাই। সেখানে কী দেখি? সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের সামনে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর ব্যানারে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশী সমবেত হন। সেখান থেকে তাঁরা মিছিল করে টিএসসির সামনে রাজু ভাস্কর্যের কাছে জড়ো হন। এই সমাবেশ থেকে ৪ জুলাই পর্যন্ত সব বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দেওয়া হয়। এদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে মিছিল করেন। তাঁরা ১১টা ৫৭ মিনিট থেকে ১০ মিনিট ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে প্রতীকী অবরোধ করেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও একই দাবিতে নিজ নিজ চত্বরে কর্মসূচি পালন করেন। এভাবেই শুরু।
১৪ জুলাই: টার্নিং পয়েন্ট
১৪ জুলাই ছিল একটা টার্নিং পয়েন্ট। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন থেকে এসে এক সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ব্যাপারে উষ্মা প্রকাশ করে মন্তব্য করেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে এত ক্ষোভ কেন? মুক্তিযোদ্ধাদের নাতিপুতিরা (চাকরি) পাবে না? তাহলে কি রাজাকারের নাতিপুতিরা চাকরি পাবে?’ তাঁর এই কটাক্ষের প্রতিক্রিয়া হয় ভীষণ। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যাপক ব্যাপ্তি ঘটে। মুক্তিযুদ্ধের অনেক পরে জন্ম নেওয়া হাজার হাজার শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে স্লোগান দেন, ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার; কে বলেছে কে বলেছে, স্বৈরাচার স্বৈরাচার’। হাসিনার অনুগত লোকেরা শিক্ষার্থীদের এই স্লোগানের প্রথম অংশটুকু নিয়ে মাতম শুরু করেন। তাঁরা বলতে থাকেন, রাজাকারেরা এ আন্দোলন করছে। নিজেদের পিঠ বাঁচাতে ও বদমতলব থেকে তাঁরা স্লোগানের দ্বিতীয় অংশটুকু এড়িয়ে যান। তাঁদের সঙ্গে জুটে যান কিছু অনুগত বুদ্ধিজীবী।
এখানে মুক্তিযোদ্ধা-রাজাকার বিভাজনটি নিয়ে আসেন ক্ষমতাসীনেরা। শিক্ষার্থীরা মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিল চাননি। তাঁরা চেয়েছিলেন যৌক্তিক সংস্কার। হাসিনা এটিকে তাঁর রাজনীতির পুঁজি করলেন। এখানে একটি বিষয় ভেবে দেখা দরকার। তাহলেই বোঝা যাবে, শিক্ষার্থীরা কেন বিপুল সংখ্যায় হাসিনার বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলেন।
মুক্তিযোদ্ধা-রাজাকার সংখ্যা ও বাস্তবতা
এ দেশে মুক্তিযোদ্ধা আর রাজাকারের সংখ্যা কত? আমার মনে হয় সমান সমান। লাখ দুয়েক সনদধারী মুক্তিযোদ্ধা আছেন। তাঁদের বেশির ভাগই দেশে যুদ্ধ করেননি। ভারতে শরণার্থী ছিলেন। কেউ কেউ ছিলেন অন্যান্য দেশে। একাত্তরের ডিসেম্বরে তাঁরা দেশে ফিরে আসেন। হয়তো লাখখানেক লোককে তৎকালীন সামরিক সরকার রাজাকার হিসেবে নিবন্ধিত করেছিল। এঁদের অনেকেই আবার ছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যকারী। তাঁদের সবুজসংকেত না পেলে আমরা মহাসড়ক বা রেলওয়ে কালভার্ট পার হতাম না। এটি আমার নিজের অভিজ্ঞতা।
যাহোক, এই সনদধারী মুক্তিযোদ্ধা আর নিবন্ধিত রাজাকারদের বাইরে আছেন কোটি কোটি মানুষ। তাঁদের বেশির ভাগই ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে। আমরা তাঁদের বলতে পারি ‘অমুক্তিযোদ্ধা’। উদাহরণ হিসেবে আমরা শেখ হাসিনার কথা বলতে পারি। তিনি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না। ১৯৭১ সালে তিনি ঢাকায় স্বাভাবিক জীবন যাপন করেছেন। তাঁর স্বামী পরমাণু কমিশনে নিয়মিত অফিস করতেন। তাই বলে তিনি রাজাকার নন। আমি তো তাঁর সন্তানদের রাজাকারের সন্তান বলব না। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ ‘অমুক্তিযোদ্ধা’ পরিবারের সন্তান ও নাতিপুতিরা কেন কোটা–বৈষম্যের শিকার হবেন—এটি একটি নীতিগত প্রশ্ন। আরেকটি কথা বলা যায়। যিনি মুক্তিযুদ্ধ করেছেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর শিশুসন্তান কিংবা পরে জন্ম নেওয়া সন্তানের কী ভূমিকা আছে তার মা-বাবার মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার ব্যাপারে? মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর তো আরও অনেক পদ্ধতি আছে।
আন্দোলনের বিস্তার ও পতন
ফলে যেটি হলো, বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যোগ দিলেন, যাঁদের বেশির ভাগ এসেছেন স্বাধীনতার পক্ষের ‘অমুক্তিযোদ্ধা’ পরিবারগুলো থেকে। তাঁদের সঙ্গে এককাট্টা হলেন সমাজের অন্যান্য অংশের মানুষ। ক্ষমতাসীনেরা আন্দোলনকারীদের ওপর প্রথমে তাঁদের লেজুড় সংগঠনের কর্মীদের এবং একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোকে লেলিয়ে দিলেন। আন্দোলনকারীদের লাশ পড়তে থাকল। আন্দোলন আরও বেগবান হলো। প্রতিদিনই লাশের সংখ্যা বাড়তে থাকল। ‘৩৩ জুলাই’ (৩ আগস্ট) শিক্ষার্থীদের সমাবেশ থেকে স্লোগান উঠল—‘পদত্যাগ পদত্যাগ, শেখ হাসিনার পদত্যাগ’। এই তো ইতিহাস।
আবার এসেছে জুলাই। চব্বিশের জুলাই নিয়ে আরও অনেক কাটাছেঁড়া হবে।
লেখক ও গবেষক: মহিউদ্দিন আহমদ



