ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে নরেন্দ্র মোদি সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীর পদত্যাগ এবং দেশের শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে কয়েক দিন ধরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন শত শত শিক্ষার্থী। নিজেদের ‘ককরোচ’ বা তেলাপোকা বলে পরিচয় দেওয়া এ শিক্ষার্থীরা সেখানে তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান নিয়েছেন। স্বেচ্ছায় নিজেদের ব্যঙ্গ বা ছোট করার রসাত্মক প্রবণতা থেকে জন্ম নেওয়া একটি অরাজনৈতিক আন্দোলন হলো ‘ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)’।
আন্দোলনের পটভূমি ও দাবি
এ দলের সমর্থক ‘জেনারেশন জেড’ বা জেন-জি তরুণেরা জুনের তীব্র গরম উপেক্ষা করে গত শনিবার নয়াদিল্লির নির্ধারিত প্রতিবাদস্থল যন্তর মন্তরে সমবেত হন। ভারতের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কলেজ ভর্তি এবং স্কুল শেষ করার বোর্ড পরীক্ষাগুলোতে ব্যাপক অব্যবস্থাপনার অভিযোগ এনে এ শিক্ষার্থীরা শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করছেন। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এ অবস্থান ধর্মঘট চালিয়ে যাবেন বলে জানিয়েছেন তাঁরা।
বিক্ষোভ চলাকালে আন্দোলনটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে সরকারের জবাবদিহির আহ্বান জানান। এ সময় শিক্ষার্থীরা চামচ দিয়ে ধাতব থালা বাজিয়ে, জাতীয় সংগীত গেয়ে, হাস্যরসাত্মক পোস্টার প্রদর্শন করে এবং এ আর রহমানের ‘বন্দে মাতরম’ গানের তালে তালে নেচে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।
‘ককরোচ জনতা পার্টি’র উৎপত্তি
ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত তরুণদের নিয়ে একটি অবমাননাকর মন্তব্য করেছিলেন। মূলত এর প্রতিক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) আদলে একটি ব্যঙ্গাত্মক রূপ হিসেবে এই সিজেপি গঠিত হয়। অবশ্য প্রধান বিচারপতি পরে দাবি করেছেন, তাঁর মন্তব্যটিকে ভুল প্রসঙ্গে বা খণ্ডিতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
মাত্র চার সপ্তাহের কম সময়ে আন্দোলনটি ইনস্টাগ্রামে প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ অনুসারী অর্জন করেছে, যা ভারতের ভার্চ্যুয়াল জগতে অন্যতম বড় এক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিশ্লেষকেরা এটিকে গত কয়েক বছরের মধ্যে নরেন্দ্র মোদির কর্তৃত্বের সামনে অন্যতম বড় একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন। তবে অনলাইনের এ বিপুল জনপ্রিয়তা মাঠের লড়াইয়ে বড় জনসমাগমে রূপ নিতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
তরুণদের অংশগ্রহণ ও মতামত
গত সপ্তাহের শেষের দিকে এ বিক্ষোভে কয়েক শ মানুষের উপস্থিতি ছিল। তাঁদের বেশির ভাগই ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থী, যাঁদের জীবনের সিংহভাগ সময় কেটেছে মোদির শাসনামলে। এই তরুণদের ভাষ্য, তাঁরা মোদির হিন্দুত্ববাদী মেরুকরণের রাজনীতিতে ক্লান্ত। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ২৩ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমরা সংস্কার ও উন্নয়ন চাই, কোনো ঘৃণার রাজনীতি চাই না।’
৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের তীব্র গরমের মধ্যে দাঁড়িয়ে ‘গো প্রধান গো’ (প্রধান বিদায় হও) লেখা একটি পোস্টার হাতে এক তরুণী বলেন, ‘আমার বন্ধুরা চিকিৎসক হতে চায়। তারা পরীক্ষার জন্য পড়ছে। তাই আমি বোনকে সঙ্গে নিয়ে এখানে তাদের প্রতিনিধিত্ব করতে এসেছি। তরুণদের একে অপরের পাশে দাঁড়াতে হবে। পুরোনো প্রজন্ম আমাদের হতাশ করেছে।’
শিক্ষা খাতে সংকট ও প্রশ্নফাঁস
একটি বহুল আলোচিত প্রশ্নফাঁসের ঘটনার পর মেডিক্যালের শিক্ষার্থীদের জাতীয় ভর্তি পরীক্ষা বাতিল করায় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন। সরকারি এ সিদ্ধান্তের কারণে চিকিৎসক হতে ইচ্ছুক ২৩ লাখ শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আরও লাখ লাখ শিক্ষার্থীর স্কুল সমাপনী পরীক্ষার অনলাইন গ্রেডিং বা মূল্যায়ন পদ্ধতিতে মারাত্মক ত্রুটি ধরা পড়ে।
পরে আরও প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে সরকার জনপ্রিয় মেসেজিং অ্যাপ টেলিগ্রাম নিষিদ্ধ করে। এরই মধ্যে গত রোববার বিমানবন্দরের মতো কড়া নিরাপত্তা তল্লাশি ও অন্যান্য কঠোর নজরদারির মধ্যে মেডিক্যালে ভর্তি–ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের আবারও পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। তবে অনেকের জন্য এ পদক্ষেপগুলো দেরিতে নেওয়া হয়েছে। গত মে মাসে ‘ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট’ বা নিট পরীক্ষা বাতিল হওয়া ও ২১ জুন পুনঃপরীক্ষা নেওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে অন্তত ১২ জন ভর্তি–ইচ্ছুক শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।
আন্দোলনের নেতৃত্ব ও কৌশল
এ বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের একটা অংশ ছিল ইউটিউবার। অনেক আন্দোলনকারী নিজের ইনস্টাগ্রাম পেজের জন্য এ কর্মসূচির ভিডিও ও ছবি তুলছিলেন। মূলত ইন্টারনেটে এ আন্দোলনের ব্যাপক ভাইরাল হওয়া জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে ভিউ ও ফলোয়ার বাড়ানোই ছিল তাঁদের লক্ষ্য। সহজেই হয়তো এই ‘তেলাপোকা’ আন্দোলনকে ইন্টারনেটের একটি সাময়িক উন্মাদনা বা ট্রেন্ড বলে উড়িয়ে দেওয়া যেত। কিন্তু রাতের আঁধারে যখন শত শত আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য বিক্ষোভস্থল ফাঁকা করতে সেখানে হানা দেন, তখন এই আন্দোলনকারীদের টিকে থাকার আসল পরীক্ষা শুরু হয়।
আন্দোলনকারীদের নেতা অভিজিৎ দিপকে ও তাঁর সমর্থকেরা বিক্ষোভস্থলেই ক্যাম্প করে অবস্থান করছিলেন। দিনের তীব্র গরম সহ্য করে এবং রাতে খোলা আকাশের নিচে মাটিতে ঘুমিয়ে তাঁরা পুলিশের নির্দেশ অমান্য করে নিজেদের দাবিতে অনড় রয়েছেন। টানা স্লোগান দেওয়ার কারণে গলা ভেঙে যাওয়া দিপকে বলেন, ‘আমরা অন্যায় ও বৈষম্যের শিকার হওয়া লাখ লাখ শিক্ষার্থীর জন্য ন্যায়বিচার দাবি করছি। আমরা চাই, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান এ ঘটনার দায়ভার গ্রহণ করুন।’
বোস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে সদ্য স্নাতক সম্পন্ন করা দিপকে চলতি মাসের শুরুতে এ অনলাইন আন্দোলনকে মাঠপর্যায়ে রূপ দিতে নয়াদিল্লিতে ফিরে আসেন। ৬ জুন রাজধানীতে আন্দোলনের পরিস্থিতি পরখ করার পর তিনি ভারতের বেশ কয়েকটি বড় শহরে বিক্ষোভের আয়োজন করেন। এর মধ্যে মুম্বাই, বেঙ্গালুরু, নাগপুর ও জয়পুর রয়েছে, যেখানে তিনি নিজেও হামলার শিকার হয়েছেন।
শনিবার রাতে যখন পুলিশ বিক্ষোভস্থলের সব বাতি নিভিয়ে দেয় এবং ভেতরে খাওয়ার পানি ঢোকার পথ বন্ধ করে দেয়, তখন তিনি দ্য ইন্ডিপেনডেন্টকে বলেন, ‘আমরা আমাদের দাবিতে অবিচল। আমরা এ বিক্ষোভ চালিয়ে যাব। সরকার ভাবছে, আমাদের এভাবে ক্লান্ত ও দুর্বল করে দেওয়া যাবে, কিন্তু তারা ভুল ভাবছে।’
দিপকে আরও বলেন, ‘এক কোটির বেশি শিক্ষার্থী এই প্রশ্নফাঁসের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ইতিমধ্যে ১২ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। এ অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে কোনো রাজনৈতিক আদর্শের প্রয়োজন হয় না। আদর্শিক ভেদাভেদ ভুলে সব মানুষের উচিত এখানে এসে এ আন্দোলনে যোগ দেওয়া।’
পুলিশের অবস্থান ও সরকারের প্রতিক্রিয়া
দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের সঙ্গে আলাপকালে পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, আন্দোলনকারীদের ওপর অতিরিক্ত বা লাঠিপেটার মতো কঠোর বলপ্রয়োগ না করার জন্য তাঁদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে অবশ্য পুলিশের কর্মকর্তারা বিক্ষোভস্থলের ভেতরে খাবার ও পানি নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেন। এখন পর্যন্ত এ আন্দোলনের মূল বার্তা অবশ্য শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের কান পর্যন্ত পৌঁছেছে বলে মনে হচ্ছে না। তিনি এ বিক্ষোভকে যেমন স্বীকৃতি দেননি, তেমনি আন্দোলনকারীদের সমালোচনারও কোনো জবাব দেননি। এ পুরো ঘটনা এই ধারণাকেই আরও জোরাল করে তুলেছে যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শাসনামলে সরকারের শীর্ষ মন্ত্রীদের জবাবদিহির জায়গা অনেকটাই কমে গেছে।
আন্দোলনের ভবিষ্যৎ ও প্রভাব
সাংবাদিক থেকে বর্তমানে ‘তেলাপোকা’ আন্দোলনের মুখপাত্র বনে যাওয়া সৌরভ দাস বলেন, ‘আমরা চাই, সরকার সিজেপির (ককরোচ জনতা পার্টি) প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আলোচনার একটি পথ উন্মুক্ত করুক।’ তবে এ আন্দোলন শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেবে, সে বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে দলটির সাধারণ সমর্থকদের মতোই তিনি নিজেও কিছুটা অনিশ্চয়তা প্রকাশ করেন। সৌরভ দ্য ইন্ডিপেনডেন্টকে বলেন, ‘আপাতত আমরা এখানে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছি। দেখা যাক, শেষ পর্যন্ত কী হয়।’
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ২২ বছর বয়সী ইশা শর্মা বলেন, তিনি প্রয়োজনে পুলিশের হাতে আটক হতে কিংবা বিক্ষোভ কর্মসূচিকে এ নির্দিষ্ট এলাকার বাইরে নিয়ে যেতে মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে এসেছেন। তবে এ আন্দোলনের পেছনে সুনির্দিষ্ট কোনো আদর্শিক ভিত্তি না থাকাকে তিনি একটি বড় সমস্যা বলে মনে করেন। ইশা শর্মা বলেন, ‘এটি নেতৃত্বহীন একটি আন্দোলন। এর পেছনে কোনো আদর্শিক কাঠামো বা রাজনৈতিক সমর্থন নেই। তা সত্ত্বেও ন্যায়বিচার আদায়ের লড়াইটা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
৩০ বছর বয়সী বিজয় রেড্ডি সিজেপির মূল সমন্বয়ক দলের একজন সদস্য। আন্দোলনে সংহতি জানাতে তিনি হায়দরাবাদ থেকে আরও ৯ সদস্যকে নিয়ে দিল্লিতে এসেছেন। দ্য ইন্ডিপেনডেন্টকে তিনি বলেন, ‘আমি আমার রাজনৈতিক পরিচয় হায়দরাবাদে রেখে এসেছি। আমরা এখানে এসেছি, সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে ও সিজেপির এই আয়োজনকে গুছিয়ে দিতে সাহায্য করতে।’
দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আরও অনেকে এ কর্মসূচিতে যোগ দিতে এসেছেন। তাঁদের একজন চণ্ডীগড়ের বাসিন্দা, যা দিল্লি থেকে ট্রেনে চার ঘণ্টার পথ। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া বেশির ভাগ আন্দোলনকারীর চেয়ে তিনি বয়সে বেশ বড়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি জানান, তিনি একজন হবু চিকিৎসকের বাবা। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে চিকিৎসাশাস্ত্রে উচ্চতর ডিগ্রিতে পড়াশোনা করছে। যেসব স্বপ্নবাজ হবু চিকিৎসকেরা হতাশায় আত্মহত্যা করেছেন, তাঁদের পরিবারের কষ্ট ও বেদনা আমি নিজের মনে অনুভব করতে পারি। এ সন্তানেরা নিজেদের দাবিগুলো সোচ্চারভাবে তুলে ধরে দারুণ একটি কাজ করছেন।’
সিজেপির দাবিগুলো মূলত শিক্ষা খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত হলেও এটি ভারতের সাধারণ তরুণ সমাজের মধ্যে ব্যাপকভাবে সাড়া ফেলেছে। ভারতের মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশই তরুণ। তাঁরা বর্তমানে ক্রমাগত সংকুচিত হতে থাকা কর্মসংস্থান ও ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের সংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন। ভারত সরকারের ‘পিরিওডিক লেবার ফোর্স সার্ভে’ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ছিল ৯ দশমিক ৯ শতাংশ, যা শহরাঞ্চলে ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে।
সিজেপির এ মাঠপর্যায়ের সাফল্য মূলত দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে চলা একটি বড় প্রবণতাকে ফুটিয়ে তোলে। সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের হাত ধরে গড়ে ওঠা এই তরুণদের আন্দোলনগুলো কতটা শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে, তার প্রমাণ মিলেছে শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালের সাম্প্রতিক সরকার পতনের আন্দোলনগুলোতে। ভারতে হয়তো এখনই তেমন বড় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরিস্থিতি তৈরি হবে না, তবে ‘তেলাপোকা’দের দেওয়া এ বার্তাটি একদম পরিষ্কার, ‘আমাদের অবহেলা করলে তার চড়া মূল্য দিতে হবে।’



