নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মধ্যে বিরোধের সূত্র ধরে দেশে সংঘাত সৃষ্টির অপেক্ষায় রয়েছে। দলটি মনে করছে, এই গোলযোগের সুযোগে তারা পুনরায় রাজনৈতিক মাঠ দখল করতে পারবে। বর্তমানে দেশে আধিপত্য বিস্তার ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে তিন দলের মধ্যে বৈরিতা দেখা যাচ্ছে। আর এই অনৈক্যের সুযোগ নিতে চাইছে আওয়ামী লীগ।
সংঘাতের অপেক্ষায় আওয়ামী লীগ
ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর নির্বাচনের বাইরে থাকা আওয়ামী লীগ সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হলেও একটি সংঘাতময় পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত। তাদের উদ্দেশ্য হলো, সেই সুযোগে দেশে ফিরে রাজনীতি দখল করা। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ও নেপথ্যে থেকে নানা ইস্যুকে উসকে দিয়ে পরিস্থিতি ঘোলা করার চেষ্টা করেছিল দলটি, কিন্তু ব্যর্থ হয়।
নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আশা ভঙ্গ
সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ প্রত্যাশা করেছিল কোনোভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে। কিন্তু অধ্যাদেশ জারি করে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে অন্তর্বর্তী সরকার। ফলে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি তারা। নির্বাচনের পর দলটির আশা ছিল, বিএনপি সরকার অন্তত তাদের রাজনীতি করার সুযোগ দেবে। কিন্তু সংসদে অধ্যাদেশ পাশ হয়ে আইনে পরিণত হওয়ায় সেই আশা আরও কমে যায়।
এখন আওয়ামী লীগ বিএনপি সরকারের ব্যর্থতা দেখতে আগ্রহী। তারা চায়, তিন দলের মধ্যে বিরোধের সূত্র ধরে গোলযোগ তৈরি হোক, যাতে তারা দেশে ঢুকে পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতামত
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম বলেন, জুলাই মুভমেন্টের মধ্যে ফাটল দেখা দিলেই তৃতীয় কোনো দল বা আওয়ামী লীগ সুযোগ নেবে। তিনি উল্লেখ করেন, ইতোমধ্যে বিভিন্ন জায়গায় আওয়ামী লীগের মিছিল-মিটিং হচ্ছে, যা বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির ঐক্যের ফাটলের অংশ। জাতীয় স্বার্থে দলগুলোকে পরস্পরবিরোধী অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
দলগুলোর মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর সংবিধান সংস্কারসহ বিভিন্ন ইস্যুতে দলগুলোর মধ্যে দূরত্ব বেড়েছে। সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিএনপি এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন পাওয়া জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে ঐকমত্যের অভাব দেখা যাচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এনসিপি। দীর্ঘদিন ধরেই দলগুলোর মধ্যে সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ চলছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সিন্ডিকেট ভাঙার মতো মৌলিক ইস্যুতে দলগুলো একক সিদ্ধান্তে আসতে পারছে না। বরং একে অপরের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা অব্যাহত রেখেছে। জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির রাজনৈতিক ঐক্য থাকলেও অনেক ইস্যুতে ভিন্নমত রয়েছে।
আওয়ামী লীগের কৌশল
কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগ মাঠের রাজনীতিতে কোণঠাসা। তবে দলটির একটি বড় অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও চোরাগুপ্তা নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির মধ্যবর্তী বিরোধ আরও উসকে দেওয়ার কৌশল নিয়েছে। রাজধানীসহ সারা দেশে প্রায়ই দলটির নেতাকর্মীদের ঝটিকা মিছিল করতে দেখা যাচ্ছে। কোথাও কোথাও বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির নেতাকর্মীদের ওপর অতর্কিত হামলার মতো সাহসও দেখাচ্ছেন তারা।
কয়েকদিন আগে নোয়াখালীতে বড় একটি ঝটিকা মিছিল করেছে আওয়ামী লীগ। ৭ জুন কুমিল্লার সদর দক্ষিণ এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের কর্মীরা ঝটিকা মিছিল বের করেন। একই সময়ে ঝিনাইদহ ও ময়মনসিংহের ভালুকায় ঝটিকা মিছিল করেন সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এছাড়া ৩ জুন গোপালগঞ্জ ও পটুয়াখালীতে এবং ৬ জুন চট্টগ্রামে তাদের মিছিল করার খবর পাওয়া যায়।
বিএনপির অবস্থান
বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল এসব কর্মকাণ্ডের জন্য জামায়াতের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, ওই দলটির বর্তমান আমির ও সেক্রেটারি জেনারেল একসময় জাসদ করতেন, যা মূলত আওয়ামী লীগের অংশ। ফলে ইসলামের নাম নিলেও তারা ভেতরে-ভেতরে পুরোনো আওয়ামী লীগের উত্তরাধিকার বহন করছেন। তিনি প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলগুলোকে সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, যুক্তিহীন বিরোধিতার নেতিবাচক রাজনীতি ১৯৭২-৭৫ সাল থেকে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনা করে এসেছে, যা বর্তমান সময়ে কাম্য নয়।
জামায়াতের বক্তব্য
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করা আর বর্তমান সরকারের সমালোচনা করা এক জিনিস নয়। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ স্বৈরাচারী কর্মকাণ্ডের জন্য গণ-অভ্যুত্থানে বিদায় নিয়েছে। কিন্তু বিএনপি এখন ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে সেই আওয়ামী লীগকেই রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসনের চেষ্টা করছে, যার বিরোধিতা আমাদের করতেই হবে। তিনি আরও বলেন, বিএনপি দেশের কল্যাণ চাইলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই চরম অবনতি হতো না।
এনসিপির দৃষ্টিভঙ্গি
এনসিপির যুগ্ম-আহ্বায়ক মনিরা শারমিন বলেন, এনসিপি, জামায়াত ও বিএনপির মধ্যে বৈরিতা চলমান থাকলে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সুযোগ নেবে এবং নিচ্ছেও। দলগুলোর মধ্যে বিভেদ এবং জাতীয় সংসদে একে অপরের বিরুদ্ধে বক্তব্য উঠলে আওয়ামী লীগ ফেরার শক্তি পাচ্ছে। তিনি বলেন, আসছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সরকার তথা বিএনপি আওয়ামী লীগকে কাজে লাগিয়ে স্থানীয় নির্বাচনে জয়ের স্বপ্ন দেখছে। আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ থাকলেও দল হিসাবে নিষিদ্ধ হয়নি। তিনি প্রশ্ন তোলেন, আওয়ামী লীগ কি হাসিনা? আওয়ামী লীগ তো একটি প্রতিষ্ঠান হিসাবে বর্বরতা চালিয়েছে, সুতরাং অপরাধ দল হিসাবে করেছে। দলকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করতে হবে। দেশের সবকটি রাজনৈতিক দলকে ঐক্য হতে হবে, তবে সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে বিএনপিকে।



