পাহাড়ের আদিবাসীদের বঞ্চনার কথা বারবার আলোচনায় এলেও সমতলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর দীর্ঘশ্বাস যেন অরণ্যেই রোদন হয়ে রয়ে গেছে। দশকের পর দশক ধরে বঞ্চনার শিকার হওয়া সেই কণ্ঠস্বর এবার প্রতিধ্বনিত হবে জাতীয় সংসদের অলিন্দে।
সংরক্ষিত আসনে আন্না মিনজ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য আন্না মিনজ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, পার্বত্য অঞ্চলের চেয়ে সমতলের আদিবাসীরা অনেক বেশি অবহেলিত। তাদের ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দেওয়াই হবে তার সংসদীয় লড়াইয়ের মূল লক্ষ্য।
আন্না মিনজ নিজে ওরাওঁ সম্প্রদায়ের সন্তান হওয়ায় বঞ্চনার ক্ষতটা তার ভেতরেই রয়েছে। আক্ষেপের সুরে তিনি বলেন, 'আমার পূর্বপুরুষদের জমিজমা প্রভাবশালীদের কবজায়। আইনি লড়াই আর প্রভাবশালী মহলের চোখরাঙানির সামনে এ অঞ্চলের আদিবাসীরা আজ বড় নিঃস্ব ও অসহায়।'
জমির মালিক থেকে ভূমিহীন দিনমজুর
ইতিহাস সাক্ষী দেয়, উত্তরবঙ্গের সাঁওতাল, ওরাওঁ, মুণ্ডা, মসহর ও বাঁশ মালির মতো জনজাতিরা এক সময় ছিল বিস্তীর্ণ কৃষিজমির মালিক; কিন্তু সময়ের আবর্তে কৃষি ও অরণ্য হারিয়ে তারা আজ অস্তিত্বের সংকটে। যে মানুষগুলো এক সময় নিজের জমি চাষ করতেন, আজ তারাই অন্যের জমিতে কৃষিশ্রমিক বা দিনমজুর। সারা বছর কাজ না থাকায় কোনোদিন এক বেলা খেয়ে, আবার কোনোদিন না খেয়েই কাটে তাদের জীবন।
সংসদে বঞ্চনার কথা তুলে ধরার অঙ্গীকার
সংসদ সদস্য হিসেবে আন্না মিনজের প্রথম অঙ্গীকার হলো— সংসদে আদিবাসীদের এই চরম দুর্দশা ও ভূমিহীন হওয়ার সংকট তুলে ধরা। তিনি মনে করেন, রাষ্ট্রের বলিষ্ঠ পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া তাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। আন্না মিনজ বলেন, 'বিএনপির ৩১ দফায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মৌলিক অধিকারের যে স্পষ্ট অঙ্গীকার করা হয়েছে, সেই বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটানোর সুযোগই আমি জাতীয় সংসদে পেয়েছি।'
পরিবার ও শেকড়ের টান
আন্না মিনজের শেকড় ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার আউলিয়াগপুর ইউনিয়নের মাদারগঞ্জ গ্রামে। তার পরিবার কেবল কৃষিনির্ভর নয়, দেশপ্রেমের আদর্শেও বলিষ্ঠ। তার বড় ভাই রবিন মিনজ ১৯৭১ সালের বীর মুক্তিযোদ্ধা। ছোট ভাই আমরুশ মিনজ ছিলেন ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য এবং বাবা পাউলুস মিনজ একজন আদর্শ কৃষক। সংগ্রামী এই পরিবারের মূল্যবোধ ধারণ করেই আন্না এখন উত্তর জনপদের প্রান্তিক মানুষের আশার আলো।
নারী অধিকারেও লড়াই
আন্না মিনজ শুধু ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী নয়, নারীদের অধিকার আদায়েও সমানভাবে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, নিজের শেকড়ের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা আর গণমানুষের জন্য কাজ করার জেদই হবে তার আগামীর পথচলার মূল শক্তি।
উত্তরের প্রান্তিক জনপদ থেকে রাজধানীর সংসদ ভবন— দূরত্ব অনেক। তবে আন্না মিনজের মতো লড়াকু প্রতিনিধিরা সেই দূরত্ব ঘুচিয়ে সমতলের অবহেলিত মানুষের মনে নতুন স্বপ্নের বুনিয়াদ গড়বেন- এমনটাই প্রত্যাশা সবার।



