বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস ২০২৬ উপলক্ষে সম্পাদক পরিষদ ও নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন দ্য ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম। রোববার বিকেলে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এ সভায় তিনি সাংবাদিকদের পেশাগত স্বাধীনতার পাশাপাশি দায়িত্ববোধ জাগ্রত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বের সম্পর্ক
মাহফুজ আনাম বলেন, স্বাধীন সাংবাদিকতার দাবি শুধু সরকারের হস্তক্ষেপ প্রতিরোধে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। বরং নিজেরাও কতটা দায়িত্বশীল ও মূল্যবোধভিত্তিক সাংবাদিকতা করছেন, সে প্রশ্ন তোলার সময় এসেছে। স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখতে হলে সাংবাদিকদের সৎ ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে বলে স্মরণ করিয়ে দেন তিনি।
সংবিধানে সাংবাদিকতার গুরুত্ব
সভায় মাহফুজ আনাম উল্লেখ করেন, সংবিধানে বিচার বিভাগ ও সংবাদমাধ্যম—এই দুই পেশাকে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা সাংবাদিকতার গুরুত্ব ও দায়িত্বের প্রতিফলন। তিনি বলেন, যেসব দেশে স্বাধীন সাংবাদিকতা শক্তিশালী, সেসব দেশেই গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার সুপ্রতিষ্ঠিত।
আত্মসমালোচনার প্রয়োজনীয়তা
সাংবাদিকদের একটি বড় অংশ অনেক সময় নিজেদের দায়িত্ব যথাযথভাবে উপলব্ধি করেন না বলে নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন মাহফুজ আনাম। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘আমরা কি সত্যিকার অর্থে দেশের কল্যাণের জন্য কাজ করছি, নাকি কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করছি?’
মালিকদের হস্তক্ষেপের সমালোচনা
সাংবাদিকতার স্বাধীনতা রক্ষায় সম্পাদক ও মালিকদের ভূমিকা নিয়েও কথা বলেন মাহফুজ আনাম। গণমাধ্যমে মালিকদের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এতে পেশার মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সম্পাদক পরিষদ থেকে সম্পাদক ও মালিকদের জন্য পৃথক আচরণবিধি প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও সভায় তুলে ধরেন তিনি।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান
সাংবাদিকদের ধনী-দরিদ্র বৈষম্য, সাধারণ মানুষের অধিকার, আইনের শাসন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে আরও বেশি মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান মাহফুজ আনাম। তিনি বলেন, গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকার মাধ্যমে এসব বিষয় সামনে আনা জরুরি।
প্রযুক্তি ও নৈতিকতা
আধুনিক সাংবাদিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সাংবাদিকদের দক্ষতা বাড়ানো জরুরি বলে উল্লেখ করেন মাহফুজ আনাম। তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেমন একটি চ্যালেঞ্জ, তেমনি এটি সাংবাদিকতার মানোন্নয়নে সহায়কও হতে পারে। তবে প্রযুক্তির পাশাপাশি নৈতিকতার বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দেন তিনি। ‘আমাদের আরও বেশি এথিক্যাল (নৈতিকতাসম্পন্ন) হতে হবে। কাউকে হেয় করার উদ্দেশ্যে নয়, বরং সমাজের স্বার্থ তুলে ধরাই হওয়া উচিত সাংবাদিকতার লক্ষ্য,’ বলেন মাহফুজ আনাম।
অন্যান্য বক্তারা
সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীরের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন নোয়াব সভাপতি ও মানবজমিন পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, সাবেক গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ, প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ, ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস সম্পাদক শামসুল হক জাহিদ, কালের কণ্ঠ সম্পাদক ও জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ, ইনকিলাব সম্পাদক এ এম এম বাহাউদ্দীন, ঢাকা ট্রিবিউন সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ, সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী, সময়ের আলোর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম ও সংবাদের নির্বাহী সম্পাদক শাহরিয়ার করিম। সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও বণিক বার্তা সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ আলোচনা সভা সঞ্চালনা করেন।



