পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের আর ২৪ ঘণ্টাও বাকি নেই। ভারতের নির্বাচন কমিশন একসঙ্গে পাঁচটি রাজ্যের ভোটের ফল প্রকাশ করতে যাচ্ছে। তবে পুরো ভারতের নজর এখন কেবল পশ্চিমবঙ্গের দিকে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি তার ক্ষমতা ধরে রাখতে পারবেন, নাকি এবার সেখানে সরকার গঠন করবে বিজেপি? গত ২৯ এপ্রিল দ্বিতীয় ও শেষ দফার ভোট গ্রহণ শেষ হওয়া মাত্রই রাজনৈতিক পণ্ডিতেরা তাদের বুথফেরত জরিপের পূর্বাভাস নিয়ে হাজির হয়েছেন।
বুথফেরত জরিপের চমকপ্রদ পূর্বাভাস
এবারের বুথফেরত জরিপগুলোর সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো, অধিকাংশ সংস্থাই পশ্চিমবঙ্গে এবার বিজেপির সরকার গঠনের সম্ভাবনার কথা বলছে। তবে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই সব বুথফেরত জরিপকে সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন এবং তার দলের জন্য ২০০-র বেশি আসন পাওয়ার ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন।
কী বলছে এবারের বুথফেরত জরিপ?
বেশিরভাগ বুথফেরত জরিপ অনুযায়ী, অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস (এআইটিসি) প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবার এই রাজনৈতিক লড়াইয়ে হারতে চলেছেন। জরিপগুলোর পূর্বাভাস বলছে, বিজেপি এবার সংখ্যাগরিষ্ঠতার জাদুকরী সংখ্যা পার করে রাজ্যে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। কিন্তু এখানে আসল প্রশ্ন হলো, এই বুথফেরত জরিপগুলোর ওপর আসলে কতটা ভরসা করা যায়? কারণ, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও এই ধরনের বুথফেরত জরিপগুলো সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হয়েছিল।
জরিপের আসন পূর্বাভাস
২৯৪ আসনের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় সরকার গঠনের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন ১৪৮টি আসন। ২০২১ সালের নির্বাচনে তৃণমূল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছিল এবং বিজেপির দখলে ছিল ৭৭টি আসন। এবারের বিভিন্ন জরিপের পূর্বাভাস নিম্নরূপ: ম্যাট্রিজের জরিপ অনুযায়ী, বিজেপি পেতে চলেছে ১৪৬ থেকে ১৬১টি আসন, তৃণমূল পাচ্ছে ১২৫ থেকে ১৪০টি আসন, অন্যদের ঝুলিতে যেতে পারে ছয় থেকে ১০টি আসন। চাণক্য স্ট্র্যাটেজির জরিপ অনুসারে, বিজেপি ১৫০ আসনের বেশি পেতে পারে, তারা পেতে পারে ১৫০ থেকে ১৬০টি আসন, তৃণমূল পেতে পারে ১৩০ থেকে ১৪০টি আসন, অন্যদের ৬ থেকে ১০টি আসন দেওয়া হয়েছে। জেভিসির জরিপে বিজেপি ১৩৮-১৫৯ এবং তৃণমূল ১৩১-১৫২, পোল ডায়েরির মতে বিজেপি ১৪২-১৭৭ ও তৃণমূল ৯৯-১২৭, পি মার্কের জরিপে বিজেপি ১৫০-১৭৫ ও তৃণমূল ১১৮-১৮৮।
২০২১ সালের পূর্বাভাস বনাম আসল ফলাফল
বুথফেরত জরিপকে যে অন্ধভাবে বিশ্বাস করা যায় না এবং জরিপের পূর্বাভাসের সঙ্গে আসল ফলাফলের যে এক বিশাল ব্যবধান তৈরি হতে পারে, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ ২০২১ সালের পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচন। ২০২১ সালের নির্বাচনের পর বুথফেরত জরিপগুলো তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে এক তীব্র ও হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিয়েছিল। সেই সময়ে জরিপগুলোতে বলা হয়েছিল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২৯২টি আসনের মধ্যে ১৫৬টির মতো আসন পেতে পারেন। অন্যদিকে বিজেপি এক শক্ত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে ১২১টির মতো আসন পেতে পারে বলে আভাস দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ, লড়াই হওয়ার কথা ছিল সমানে সমানে। কিন্তু যখন আসল ফলাফল প্রকাশ পাওয়ার পর এক সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। তৃণমূল কেবল সরকার গঠনই করেনি, বরং ২১৫টি আসনে বিশাল জয় পেয়ে বুথফেরত জরিপকে একরকম উড়িয়ে দিয়েছিল। অন্যদিকে যে বিজেপি ১২১টি আসন পাবে বলে আশা করা হয়েছিল, তারা মাত্র ৭৭টি আসন পেয়েই থমকে যায়।
সাধারণত বুথফেরত জরিপগুলো সঠিক প্রবণতা দেখালেও, অনেক সময়ই চূড়ান্ত সংখ্যায় এক বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে তাই কোনও জরিপের পূর্বাভাসের ওপর চোখ বুজে ভরসা করা যায় না; এর জন্য চূড়ান্ত ফলাফলের দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হবে।
মমতার দাবি: ২০০-র বেশি আসন
ভোট গণনার দায়িত্বে থাকা এজেন্টদের উদ্দেশে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বুথফেরত জরিপের সব পূর্বাভাস উড়িয়ে দিয়েছেন। তৃণমূল নেত্রীর মতে, এই বুথফেরত জরিপগুলো আসলে ‘শেয়ার বাজার নিয়ন্ত্রণের’ এক ধরনের অপচেষ্টা মাত্র। তারা ২০২১ সালে এই কাজ করেছে, ২০২৪ সালেও করেছে এবং এখনও করছে।



