আগরতলা মামলায় জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে সংসদে বিতর্ক
আগরতলা মামলায় জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে সংসদে বিতর্ক

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্তির জন্য জামায়াতে ইসলামী আন্দোলন করেছিল বলে সংসদে বক্তব্য রেখেছেন চট্টগ্রাম-১৫ আসনের দলীয় এমপি শাহজাহান চৌধুরী। এতে রাজনৈতিক মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তার দাবি, শেখ মুজিবের মুক্তির জন্য ডেমোক্র্যাটিক অ্যাকশন কমিটিতে (ডিএসি) তৎকালীন জামায়াতের প্রতিনিধিত্ব ছিল। সেই কমিটির সেক্রেটারি ছিলেন গোলাম আযম এবং তখনকার জোটের আরেকটি সংগঠনের জয়েন্ট সেক্রেটারি ছিলেন প্রয়াত আব্দুস সামাদ আজাদ।

সংসদে কী বললেন শাহজাহান চৌধুরী?

মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ২৩তম দিনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় তিনি এসব দাবি করেন। শাহজাহান চৌধুরী বলেন, "মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান সাহেব যখন আগরতলার ষড়যন্ত্রের মামলায় গ্রেফতার হয়েছিলেন, তখনকার জামায়াত ইসলামী পাকিস্তান ডেমোক্র্যাটিক অ্যাকশন কমিটির মাধ্যমে মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্তির জন্য আন্দোলন করেছিল। শুধু আন্দোলন নয়, আমাদের সাবেক আমির আন্দোলনের নেতা—যিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকার আদায়ের জন্যে ১৯৪৮, ১৯৭২ ও ১৯৭৬ সালে বক্তব্য দিয়েছেন। মরহুম শেখ মুজিবের মুক্তির জন্য যে ডাইরেক্ট অ্যাকশন কমিটি হয়েছিল, সেই অ্যাকশন কমিটির সেক্রেটারি ছিলেন অধ্যাপক গোলাম আযম। সেই জোটের একটি সংগঠনের জয়েন্ট সেক্রেটারি ছিল আব্দুস সামাদ আজাদ সাহেব। শেখ মুজিবুর রহমানের আগরতলা ষড়যন্ত্রের মামলা থেকে মুক্তির জন্য সবচেয়ে বেশি অর্থ জোগান দিয়েছিল তৎকালীন পাকিস্তান আমলে জামায়াতে ইসলামী। তাই জামায়াতের ইতিহাস হচ্ছে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা ইতিহাস, জামায়াতের ইসলামীর ইতিহাস হচ্ছে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাস। জামায়াতে ইসলামীকে আপনারা বারবার অনেক তকমা দিয়েছিলেন। কোনও তকমাই জনগণ বিশ্বাস করেনি।"

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রাজনৈতিক মহলে প্রতিক্রিয়া

শাহজাহান চৌধুরীর এই বক্তব্য নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা হচ্ছে। অনেকে বিষয়টিকে বিভিন্নভাবে বিশ্লেষণ করছেন। আসলেই কি বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য জামায়াত আন্দোলন করেছিল? যদি করেই থাকে, তাহলে এতদিন গোপন রাখা হয়েছে কেন- এমনও প্রশ্ন উঠছে। তবে এই বক্তব্যকে এক ধরনের মিথ্যাচার বলে মন্তব্য করেছেন কয়েকজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষক। তারা মনে করেন, মুক্তিযুদ্ধে তাদের বিতর্কিত ভূমিকাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে হঠাৎ এমন দাবি সামনে নিয়ে আসা হয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জানতে চাইলে ডাকসুর সাবেক ভিপি ও প্রবীণ রাজনীতিবিদ মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, "এ ধরনের দাবি সম্পূর্ণ উদ্ভট। কারণ ১৯৬৯ সালে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের এই আন্দোলনের মূল দাবি ছিল আইয়ুব খানের পদত্যাগ। এর সঙ্গে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার ও রাজবন্দিদের মুক্তির দাবি ছিল। যে মামলার আসামি ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমানসহ অনেকে। তবে একক কোনও দাবি নিয়ে আন্দোলন হয়নি। সেই আন্দোলনে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদসহ অনেকে ছিলেন। কিন্তু গোলাম আযমের নাম ছিল কিনা আমার জানা নেই।" তিনি এ দাবিকে হাস্যকর বলে অভিহিত করেন।

১১ দফা আন্দোলনের ইতিহাস

১১ দফা আন্দোলনে কী ছিল খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৬৮ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিরুদ্ধে ১৯৬৯ সালে ১১ দফার ভিত্তিতে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন হয়। এর মধ্যে ছিল আওয়ামী লীগ (৬ দফাপন্থি) ও ন্যাপ (ওয়ালী খান গ্রুপ), জমিয়তে ওলেমা-ই-ইসলামসহ ৮টি রাজনৈতিক দল। উল্লেখযোগ্য দাবিগুলো হচ্ছে—শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার ও কুখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় অর্ডিন্যান্স বাতিল, বঙ্গবন্ধুর ৬-দফা অন্তর্ভুক্ত করা, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার ও রাজবন্দিদের মুক্তি, ভোটাধিকার ও সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করা, ব্যাংক, বিমা, পাট এবং ভারী শিল্প রাষ্ট্রীয়করণ, কৃষকের খাজনা ও কর হ্রাস এবং পাটের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা, শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ও ধর্মঘটের অধিকার এবং এসইটিও, সেন্টো চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসা।

জানা গেছে, এই আন্দোলনের তীব্রতায় আইয়ুব খান আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দিতে বাধ্য হন এবং ২৫ মার্চ ১৯৬৯ সালে আইয়ুব খান পদত্যাগ করেন।

ইতিহাস কী বলে?

১৯৬৯ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির জন্য জামায়াত আন্দোলন করেছে বা আর্থিক জোগান দিয়েছে, শাহজাহান চৌধুরীর এমন দাবির বিষয়ে ইতিহাসে সুনির্দিষ্ট কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে তৎকালীন ডেমোক্র্যাটিক অ্যাকশন কমিটিতে ৮টি দলের প্রতিনিধির মধ্যে তৎকালীন পাকিস্তান জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমির মিয়া মো. তোফায়েলের নাম দেখা গেছে। তবে শাহজাহান চৌধুরীর মন্তব্য অনুযায়ী গোলাম আযমের নাম পাওয়া যায়নি। আবার সেই কমিটি শুধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির জন্য আন্দোলন করেছে, এমনটি মানতে চাননি প্রবীণ রাজনীতিবিদরা। তাদের দাবি, এটি ছিল আইয়ুব খানের পতনসহ ১১ দফা দাবির আন্দোলন, যার একটি অংশে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামিদের নামও ছিল।

এ বিষয়ে রাজনীতির বিশ্লেষক ও বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, "জামায়াত শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন করেছে, তা আমি প্রথম শুনলাম। তবে তার এই বক্তব্য একেবারে চ্যালেঞ্জও করছি না। বিষয়টি এতদিন পর কেন সামনে আনা হলো তাও প্রশ্নবোধক। আমি মনে করি, একাত্তরের অপরাধ ঢাকতে তারা এই সময়ে নতুন নতুন আরও অনেক দাবি নিয়ে সামনে আসবে। তবে তারা যতই চেষ্টা করুক—দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারবে না।"

জানতে চাইলে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, "জামায়াতের এই দাবির বিষয়ে আমার জানা নেই। আমিও এই প্রথম এমন দাবি শুনলাম।"