জাতীয় সংসদের অধিবেশনে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ও দলের নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম বিএনপির মুক্তিযুদ্ধের দল হিসেবে পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বুধবার (২৮ এপ্রিল) রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, 'মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কথা বলা হয়। বিএনপি দাবি করে মুক্তিযুদ্ধের দল। অথচ বিএনপি প্রতিষ্ঠা হয়েছে ১৯৭৮ সালের পয়লা সেপ্টেম্বর আর মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে একাত্তর সালে। মুক্তিযুদ্ধের দল কীভাবে বিএনপি হতে পারে? তাহলে এটা কীভাবে আমি মূল্যায়ন করব? বিএনপিতে মুক্তিযোদ্ধা আছে, এটা আপনি বলতে পারেন। তদ্রুপ জামায়াতে ইসলামীতেও মুক্তিযোদ্ধা আছে।'
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ
বক্তব্যের শুরুতে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাঁর ফাঁসির দণ্ডের কথা উল্লেখ করেন আজহার। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের ফলে তাঁর মুক্তি পাওয়ায় তিনি জুলাই যোদ্ধা ও শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। তিনি বলেন, 'জুলাই আন্দোলন হঠাৎ করে হয়েছে, এটা যেমন ঠিক নয়—তেমনি একটা সরকার যাবে, আরেকটা সরকার আসবে, সে জন্যও এ আন্দোলন ছিল না। একটা পরিবর্তনের আন্দোলন ছিল। এটি ছিল বলেই আমাদের ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে আমরা সুপারিশ দাঁড় করিয়েছিলাম, যার মাধ্যমে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং গণভোটের পক্ষে ৭০ শতাংশ রায় দিয়েছে।'
জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়াকে স্মরণ
সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে স্মরণ করে আজহার বলেন, প্রেসিডেন্ট জিয়া অমর হয়ে থাকবেন তিনটি কারণে: তিনি বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তিনি ঐক্যের রাজনীতি করেছিলেন এবং তিনি আধিপত্যবাদবিরোধী আন্দোলন করেছিলেন। তাঁর ৭ নভেম্বরের বিপ্লবের মাধ্যমে বাংলাদেশ আধিপত্যবাদমুক্ত হয়। বেগম খালেদা জিয়া অমর হয়ে থাকবেন, তিনি বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছেন, তিনি জনগণের কাছে খেতাব পেয়েছেন আপসহীন নেত্রী। তিনিও ঐক্যের রাজনীতি করেছেন।
জামায়াতের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ
আজহার দাবি করেন, বিগত ১৬ বছরে জামায়াতে ইসলামীর চেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার আর কোনো দল হয়নি। তিনি বলেন, 'আর কোনো দলের প্রধান নেতা থেকে আরম্ভ করে সেক্রেটারি জেনারেল থেকে আরম্ভ করে ১১ জন নেতাকে জেলখানায় ফাঁসি দিয়ে এবং বিনা চিকিৎসা হত্যা করা হয়নি। জামায়াতে ইসলামী প্রমাণ করেছে, তারা বাংলাদেশের জনগণকে ভালোবাসে। তারা ভয় পেয়ে জীবন রক্ষা করার জন্য, সুন্দর জীবন যাপন করার জন্য কোনো সময় দেশ থেকে পালিয়ে যায়নি। ফাঁসির মঞ্চে গিয়েছেন, শহীদ হয়েছেন, দেশ তো ছাড়েন নাই।'
বিএনপির সমালোচনা
আজহার বিএনপির সমালোচনা করে বলেন, 'আপনি একদিকে ঐক্যের কথা বলবেন, আবার ঐক্য বিনষ্ট হয় জাতীয় সংসদে এ ধরনের কথাও বলবেন, আর পরবর্তী সময় আমাদের নসিহত করবেন যে আপনি এমন কথা বলেন কেন, যেটাতে ঐক্য নষ্ট হবে। আমরা তো শহীদ জিয়া, বেগম জিয়ার মুখে এমন কথা শুনিনি।' তিনি প্রশ্ন তোলেন, 'আপনারা কি অস্বীকার করবেন, নিজামী সাহেবসহ আমরা যখন গ্রেপ্তার ছিলাম, আমাদের মুক্তির দাবি বেগম খালেদা জিয়া করেছিলেন? তাহলে কি আপনি বলবেন, উনি মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তিকে বা দলগুলো–লোকগুলোর মুক্তির আন্দোলন করেছিলেন? কারণ, উনি ঐক্যের রাজনীতি চেয়েছেন। বিভক্ত রাজনীতির মাধ্যমে কোনো দেশ কোনোভাবেই এগিয়ে যেতে পারে না। কিন্তু সেটাই দেখতে পাচ্ছি।'
প্রসঙ্গত, গত মঙ্গলবার সংসদে বিএনপির সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান বলেছিলেন, কোনো মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের কেউ জামায়াতে ইসলামী করতে পারে না, কোনো শহীদ পরিবারের কেউ জামায়াত করতেই পারে না, করলে এটা ডাবল অপরাধ। তাঁর এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সংসদে উত্তেজনা ছড়ায়।
রাষ্ট্রপতির সমালোচনা
আজহার রাষ্ট্রপতির কঠোর সমালোচনা করে বলেন, 'এই প্রেসিডেন্ট কে? তিনি আওয়ামী লীগের দোসর। আওয়ামী লীগকে আমরা ফ্যাসিস্ট বলছি। আওয়ামী লীগ ফ্যাসিস্ট হওয়ার সুযোগ কীভাবে পেল? আমাদের দেশের আইন আর ভারতের সরাসরি সহযোগিতায়। আজকে সে আওয়ামী লীগ ভারতেই পালিয়ে গেছে। কিন্তু সেই আওয়ামী লীগের তৈরি করা ফ্যাসিস্টের প্রেসিডেন্ট এবং সেই আওয়ামী লীগ যে ভারতীয় আধিপত্যের দোসর ছিল, সেই প্রেসিডেন্টকে আমি কীভাবে সমর্থন করতে পারি?' তিনি প্রশ্ন তোলেন, 'সেই ফ্যাসিস্টের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার দল কীভাবে ফ্যাসিস্টের দোসর রাষ্ট্রপতিকে ধন্যবাদ জানায়?'
সংরক্ষিত নারী আসনে আওয়ামী লীগ নেত্রীকে মনোনয়ন
আজহার বিএনপির সমালোচনা করে বলেন, 'আমি অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে বলতে চাই, বিএনপি একটি বড় রাজনৈতিক দল, তাদের নেত্রীরা রাজপথে আন্দোলন করেছেন এবং তাঁদের অনেক ভূমিকা আছে। কিন্তু আশ্চর্য হয়ে দেখলাম যে তাঁদের সংরক্ষিত নারী আসনে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী থানার মহিলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদককে মনোনয়ন দিয়েছেন। কেন? এটা কি আপনাদের দৈন্যের কারণে? নাকি আপনারা কোনো শক্তিকে খুশি করতে চান, তাদের সহযোগিতায় ক্ষমতায় থাকতে চান? সে প্রশ্নের জবাব আপনারা দেবেন। এ প্রশ্ন জনগণের সামনে আছে।'
নিরাপত্তা কার্ডের প্রস্তাব
সরকারি দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ করে 'নিরাপত্তা কার্ড' প্রবর্তনের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দেন এ টি এম আজহারুল ইসলাম। তিনি সরকারি দলের উদ্দেশে বলেন, 'আমি আপনাদের হেয় করার জন্য কথা বলছি না, একবার চিন্তা করেন। দেশপ্রেমিক বলি আমরা, গণতান্ত্রিক শক্তি বলি আমরা, কিন্তু আজকে আমরা এমপিরা স্বাধীনভাবে চলতে পারছি না। আজকে আমাদের আক্রমণ (বিএনপি) করা হচ্ছে, অনেক কর্মীকে আক্রমণ করা হচ্ছে।' তিনি আরও বলেন, 'আমার এলাকার সরকারি কাজে সহযোগিতা করতে গিয়ে বিএনপির কর্মীদের দ্বারা লাঞ্ছিত হয়েছে, এখনো ভয় দেখানো হচ্ছে। এ জন্য অনেকে হাসতে হাসতে বলে, এত কার্ড পাইলাম, এখন নিরাপত্তা কার্ডের ব্যবস্থা করেন।'



