কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরের চাঞ্চল্যকর জাহাঙ্গীর মিয়া (৪২) হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। দীর্ঘ তদন্ত শেষে এক বছর পর গত ১ ও ৩ জুন পৃথক স্থান থেকে ওই দম্পতিকে গ্রেফতারের পর জট খুলেছে এ চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের। ১৮ বছরের পরকীয়া সম্পর্কের জেরে ওই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে বলে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন ওই দম্পতি।
গ্রেফতার দম্পতি ও স্বীকারোক্তি
গ্রেফতারকৃতরা হলেন- হুসনা খাতুন (৪৫) ও তার স্বামী শহীদ মিয়া (৪৮)। গ্রেফতারের পর তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পিবিআই। শুক্রবার (৫ জুন) বেলা ১১টার দিকে পিবিআই কিশোরগঞ্জ জেলা কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আব্দুল্লাহ আল মাসুদ।
ঘটনার বিবরণ
মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণ ও পিবিআই সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ২ জুলাই বিকালে কুলিয়ারচরের বড়খারচর গ্রামের জাহাঙ্গীর মিয়া নিজ বাড়ি থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন। পরিবারের লোকজন রাতে বারবার তার মোবাইলে কল দিলেও তিনি আর রিসিভ করেননি। পরদিন ৩ জুলাই বিকালে বড়খারচর মধ্যপাড়া এলাকার একটি নেপিয়ার ঘাসের জমি থেকে জাহাঙ্গীরের ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
এ ঘটনায় জাহাঙ্গীরের মা দিলুয়ারা বেগম বাদী হয়ে কুলিয়ারচর থানায় ৪ জুলাই অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা করেন। থানা-পুলিশ টানা দুই মাস তদন্ত করেও হত্যাকাণ্ডের কোনো মোটিভ খোঁজে বের করতে না পারায় পিবিআই কিশোরগঞ্জ জেলা ইউনিট মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করে।
তদন্ত ও গ্রেফতার
তারপর থেকে পিবিআই কিশোরগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আব্দুল্লাহ আল মাসুদের তত্ত্বাবধানে এবং এসআই মাহবুব আলমের নেতৃত্বে তদন্ত দল তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের সহায়তায় তদন্ত শুরু করে। ১ জুন বড়খারচর এলাকা থেকে প্রথমে হুসনা খাতুনকে গ্রেফতার করা হয়। পরে হুসনার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ৩ জুন কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার বড়পুল এলাকা থেকে তার স্বামী শহীদ মিয়াকে গ্রেফতার করে পিবিআই।
শহীদ মিয়া বৃহস্পতিবার (৪ জুন) বিকালে কিশোরগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক ফখরুল ইসলামের কাছে নিহত জাহাঙ্গীরের সঙ্গে হুসনা খাতুনের পরকীয়া প্রেমের কারণে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিলেন বলে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
পরকীয়া সম্পর্কের ইতিহাস
পিবিআইর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আব্দুল্লাহ আল মাসুদ সংবাদ সম্মেলনে বলেন, নিহত জাহাঙ্গীরের সঙ্গে হুসনা খাতুনের দীর্ঘ ১৮ বছরের পরকীয়া প্রেমের সম্পর্ক ছিল। বিয়ের আগে শুরু হওয়া এই সম্পর্ক হুসনার বিয়ের পরও চলছিল। মাঝখানে কয়েক বছর বিরতি থাকলেও হত্যাকাণ্ডের আনুমানিক তিন বছর আগে থেকে পুনরায় তাদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ও মেলামেশা শুরু হয়।
আব্দুল্লাহ আল মাসুদ সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ২ জুলাই রাতে হুসনা খাতুন ও জাহাঙ্গীর মিয়া স্থানীয় একটি নেপিয়ার ঘাসের জমিতে সাক্ষাত করেন। এদিকে হুসনার স্বামী শহীদ মিয়া তার স্ত্রীকে ঘরে না পেয়ে সন্দেহবশত একটি ছুরি নিয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে ঘাসের জমিতে আপত্তিকর অবস্থায় তাদের দেখে ফেলেন শহীদ। দীর্ঘদিনের সন্দেহ সঠিক প্রমাণিত হওয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ছুরি দিয়ে জাহাঙ্গীরের পিঠে ও গোপনাঙ্গে এলোপাতাড়ি আঘাত করে হত্যা করেন। পরে লাশ সেখানে ফেলে রেখেই তারা পালিয়ে যান।



