হুমায়ুন কবীরের প্রস্তাব: মমতাকে বিধানসভায় জিতিয়ে আনব
পশ্চিমবঙ্গে বাবরি মসজিদ গড়ার আন্দোলনের নেতা হুমায়ুন কবীর তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে নতুন রাজনৈতিক দল ‘আম-জনতা উন্নয়ন পার্টি’ গঠন করে এবারের বিধানসভা নির্বাচনে অংশ নিয়ে দুটি আসনে জয়ী হন। তবে একটি আসন ছেড়ে দিতে হয়েছে তাঁকে। নিজের সাবেক নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ‘গুরুদক্ষিণা’ দিতে সেই আসন থেকে জিতিয়ে আনার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।
হুমায়ুন কবীর গত বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই নির্বাচনে জিততে না পারলেও তাঁকে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় প্রয়োজন। তাই মমতা যদি তাঁকে অনুরোধ করেন, তবে তাঁর ছেড়ে দেওয়া রেজিনগর আসনে উপনির্বাচন করে তাঁকে জিতিয়ে আনার সর্বশক্তি নিয়োগ করবেন তিনি।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
প্রায় দেড় দশক পর এবারের নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে রাজ্যের ক্ষমতা হারিয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস। কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি প্রথমবারের মতো এই রাজ্যের ক্ষমতায় আসে। বিজেপির রাজ্য সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হন শুভেন্দু অধিকারী, যার কাছে হেরেছেন মমতা। ফলে বিধানসভায় তাঁর থাকার সুযোগ নেই।
এর মধ্যে তৃণমূলে দেখা দিয়েছে ভাঙনের ইঙ্গিত। মমতা বিধানসভায় বিরোধী দলের নেতা হিসেবে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে মনোনীত করলেও দলটির বিধায়কদের বড় অংশের বিদ্রোহে বিরোধী নেতা হয়েছেন ঋতব্রত চট্টোপাধ্যায়, যাঁকে মমতা সম্প্রতি দল থেকে বহিষ্কার করেন।
মমতার অনুপস্থিতিতে যখন বিধানসভায় তৃণমূলের নেতা হিসেবে ঋতব্রতর নাম ঘোষণা হয়েছে, তখনই মমতাকে বিধানসভায় নেওয়ার প্রস্তাব দিলেন হুমায়ুন কবীর।
হুমায়ুন কবীরের রাজনৈতিক পটভূমি
এই হুমায়ুন কবীর একসময় তৃণমূল কংগ্রেসে মমতার বেশ কাছের লোক ছিলেন। রাজ্য সরকারে মন্ত্রীও ছিলেন তিনি। কিন্তু গত বছর নিজের জেলা মুর্শিদাবাদের রেজিনগরে বাবরি মসজিদ তৈরির ঘোষণা দিয়ে তৃণমূল নেতৃত্বের রোষে পড়েন তিনি। এরপর তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করেন মমতা। হুমায়ুন তখন ‘আম-জনতা উন্নয়ন পার্টি’ গঠন করে তাঁর নতুন রাজনৈতিক যাত্রা শুরু করেন।
হুমায়ুন কবীর এবারের বিধানসভা নির্বাচনে মুর্শিদাবাদে দুটি আসন—রেজিনগর ও নওদায়—লড়ে জয়ী হন। রেজিনগরে তিনি বিজেপি প্রার্থী বাপন ঘোষকে ৬৪ হাজার ৬৬০ ভোটে এবং নওদায় বিজেপি প্রার্থী রানা মণ্ডলকে ২৭ হাজার ৯৪৩ ভোটে হারান। নওদা আসন রেখে রেজিনগর আসন ছেড়ে দিয়েছেন তিনি। সেখানে এখন উপনির্বাচন হবে।
মমতার পরাজয় ও হুমায়ুনের প্রস্তাব
সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা কলকাতার ভবানীপুরের নিজের আসনে হেরেছেন বিজেপির প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে। নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম আসনেও জয়ী হয়েছেন। তবে তিনি ভবানীপুর রেখে নন্দীগ্রাম আসন ছেড়েছেন। ফলে উপনির্বাচন হবে নন্দীগ্রামে, যেখানে ২০২১ সালের নির্বাচনে হেরেছিলেন মমতা। তবে ভবানীপুরে জিতে বিধানসভায় গিয়েছিলেন।
হুমায়ুন কবীর সাংবাদিকদের বলেন, ‘দিদি এবার জিততে পারলেন না তাঁর নিজের আসনে। দিদি যদি চান এবং নিজে থেকে বলেন, আমাকে বিধানসভায় যাওয়ার সুযোগ করে দাও; তবে আমি দিদির ডাকে সাড়া দিয়ে তাঁকে বিপুল ভোটে জিতিয়ে আনব।’
হুমায়ুন কবীরের এই ডাকে মমতা সাড়া দেবেন কি না, তা এখনো জানা যায়নি।
পরাজয়ের কারণ বিশ্লেষণ
এবারের নির্বাচনে তৃণমূলের হারের জন্য মমতার পারিবারিক শাসনের প্রয়াসকেই দায়ী করেন দলটির সাবেক নেতা হুমায়ুন কবীর। তিনি বলেন, ‘এটা সবাই জানে, মমতার লক্ষ্য ছিল, তিনি তাঁর ভাইপো সংসদ সদস্য ও তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসানোর লক্ষ্য নিয়ে এগিয়েছিলেন। আর সেই লক্ষ্য নিয়ে মমতা তৃণমূলের ঘুঁটি সাজিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মানুষ এবার অঙ্ক কষে ভোট দিয়ে মমতার চতুর্থবারের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন চুরমার করে দিয়েছেন।’



