বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু করতে ২০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রাক-অর্থায়ন স্কিম চালু করেছে সরকার। বৃহস্পতিবার (৪ জুন) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্কুলারে জানানো হয়, ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তহবিল থেকে তারল্য সহায়তার মাধ্যমে বন্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোকে ফের চালু করাই এই স্কিমের মূল লক্ষ্য।
স্কিমের মেয়াদ ও উদ্দেশ্য
এই প্রাক-অর্থায়ন স্কিমের মেয়াদ তিন বছর। এটি সরকারের আগে ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার ‘উৎপাদন ও কর্মসংস্থান পুনরুজ্জীবন’ প্রণোদনা প্যাকেজের অংশ। সুনির্দিষ্ট ঋণ সহায়তার মাধ্যমে বন্ধ কারখানা চালু করা, স্থবির রপ্তানি সচল করা ও বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাই এর উদ্দেশ্য।
ঋণের শর্ত ও সুদের হার
এই তহবিল থেকে ঋণখেলাপি, অর্থপাচার, জাল-জালিয়াতি ও আগের ঋণের অর্থ অপব্যবহার করেছে এমন প্রতিষ্ঠান ঋণ নিতে পারবে না। স্কিমের আওতায় ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংককে ৪ শতাংশ হারে সুদ পরিশোধ করবে। গ্রাহক পর্যায়ে ঋণের সুদের হার সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। ঋণ বিতরণের প্রথম ছয় মাস সুদ পরিশোধে ছাড় থাকবে।
একক কোনো প্রতিষ্ঠান বা গ্রুপের অনুকূলে ঋণের পরিমাণ ২০০ কোটি টাকার বেশি হবে না। প্রতিটি ঋণের মেয়াদ সর্বোচ্চ এক বছর, তবে তহবিলের প্রাপ্যতা ও সন্তোষজনক লেনদেনের ভিত্তিতে ঋণ নবায়নের সুযোগ থাকবে।
অংশগ্রহণের যোগ্যতা
- সব তালিকাভুক্ত ব্যাংক এই স্কিমে অংশ নিতে পারবে, তবে তার আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করতে হবে।
- বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাতের এমন প্রতিষ্ঠান ঋণ পাবে যেগুলো আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে কিংবা কার্যকর মূলধনের সংকটে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন ও সেবা দিতে পারছে না।
- রপ্তানিমুখী ও উচ্চ রপ্তানি সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এছাড়া কোনো উদ্যোক্তা অধিগ্রহণ বা ভাড়া চুক্তির মাধ্যমে বন্ধ প্রতিষ্ঠান চালু করলে তাকেও অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
- ঋণ দেওয়ার আগে ব্যাংককে প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত অবস্থা, উৎপাদন সক্ষমতা, মূলধনের প্রয়োজনীয়তা ও ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা যাচাই করতে হবে। ব্যবস্থাপনা ব্যর্থতা, প্রযুক্তিগত অদক্ষতা বা বিপণন সমস্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কেবল কার্যকর মূলধনের ঘাটতি পূরণের জন্য এই ঋণ ব্যবহার করা যাবে না।
- উৎপাদন ও কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা প্রমাণে এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ, বিকেএমইএসহ সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য সংগঠনের প্রত্যয়নপত্র থাকতে হবে। তবে প্রয়োজনে ব্যাংক নিজস্ব তদন্তের ভিত্তিতেও ঋণ অনুমোদন করতে পারবে।
অর্থ ব্যবহারের নির্দেশনা
স্কিমের অর্থ শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, কাঁচামাল সংগ্রহ, রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়ন ও অন্যান্য উৎপাদন ব্যয়ে ব্যবহার করা যাবে। তবে এ অর্থ দিয়ে কোনো বিদ্যমান ঋণ সমন্বয় বা পরিশোধ করা যাবে না। শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দেওয়ার ক্ষেত্রে নগদ লেনদেন করা যাবে না—ব্যাংক বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) হিসাবের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ করতে হবে। এজন্য প্রত্যেক শ্রমিকের জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই বাধ্যতামূলক। বেতন-ভাতা বাবদ সর্বোচ্চ চার মাসের সমপরিমাণ অর্থ ব্যয় করা যাবে।
ঋণ আদায় ও তদারকি
প্রাক-অর্থায়নের বিপরীতে গৃহীত অর্থের সুদ বা মুনাফা ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকে পরিশোধ করতে হবে। নির্ধারিত সময়ে অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বাংলাদেশ ব্যাংকে রক্ষিত চলতি হিসাব থেকে অর্থ সমন্বয় করা হবে এবং অতিরিক্ত ২ শতাংশ সুদ আরোপ করা হবে। ঋণ-সংক্রান্ত সব ঝুঁকি সংশ্লিষ্ট ব্যাংককেই বহন করতে হবে। গ্রাহক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে তা খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হবে।
ব্যাংকগুলোকে সাপ্তাহিক ভিত্তিতে সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন সংগ্রহ করতে হবে এবং প্রতি ত্রৈমাসিকে কারখানা পরিদর্শন করে প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক যে কোনো সময় সরেজমিনে ঋণ কার্যক্রম যাচাই করতে পারবে। ঋণের অপব্যবহার ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের চলতি হিসাব থেকে অতিরিক্ত ২ শতাংশ সুদে এককালীন অর্থ কর্তন করা হবে।
ঋণগ্রহীতা নির্বাচন, মঞ্জুরি, বিতরণ, দলিল সম্পাদন, ব্যবহার ও তদারকি ব্যাংকের নিজস্ব নীতিমালা অনুযায়ী পরিচালিত হবে। ঝুঁকি কমাতে ব্যাংক প্রয়োজনে কার্যকর মূলধনের বিপরীতে জামানত নিতে পারবে। যোগ্য প্রতিষ্ঠানের আগের অবলোপনকৃত ঋণ থাকলেও নির্দিষ্ট শর্তে পুনঃতফসিল বা নীতি সহায়তার আওতায় নতুন সুবিধা দেওয়া যাবে। তবে টানা ছয় মাসিক বা দুটি ত্রৈমাসিক কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে ঋণ পুনরায় মন্দ ও ক্ষতিজনক হিসেবে শ্রেণিকরণ করা হবে।
ঋণের অপব্যবহার, মিথ্যা তথ্য, জালিয়াতি বা অনিয়মের ঘটনায় ঋণগ্রহীতার তথ্য সরকারের কাছে পাঠানো যাবে এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ব্যাংক কর্মকর্তার সম্পৃক্ততা পেলে তাদের বিরুদ্ধেও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে।



