কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলায় বুড়ি তিস্তা নদীর ওপর ১২০ ফুট দীর্ঘ একটি কাঠের সেতু নির্মাণ স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে। উলিপুর রেলস্টেশনের কুলি আবদুল করিম তাঁর ২৫ বছরের হাড়ভাঙা খাটুনির সঞ্চয় দিয়ে এই সেতুটি নির্মাণ করেছেন। পুরো গ্রামবাসী এখন এই সেতুর সুফল ভোগ করছে। এই ঘটনা যেমন নাগরিক দায়িত্ববোধের একটি অসাধারণ উদাহরণ, তেমনি প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির ব্যর্থতারও এক প্রতিফলন।
দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ ও এক কুলির উদ্যোগ
দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকার হাজারো মানুষ একটি ঝুঁকিপূর্ণ রেলসেতু দিয়ে পারাপার হতেন। শিক্ষার্থী, রোগী আর শ্রমজীবীদের জন্য সেই পথটি ছিল এক মরণফাঁদ। আবদুল করিমের ভাষ্যমতে, অনেক জনপ্রতিনিধি সেখানে এসেছেন, প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। শেষ পর্যন্ত একজন দিনমজুরকে তাঁর জমানো টাকা, নিজের শখের মোটরসাইকেল এবং এমনকি পালিত খাসিটি বিক্রি করে জনগণের দুর্ভোগ লাঘবে এগিয়ে আসতে হলো। এটি আবদুল করিমের মহানুভবতা ঠিকই, কিন্তু একই সঙ্গে এটি স্থানীয় প্রশাসনের জন্য এক লজ্জাজনক অধ্যায়।
উন্নয়নের গল্প বনাম বাস্তবতা
আমাদের দেশে উন্নয়নের বড় বড় গল্প আমরা প্রায়ই শুনি। কোটি কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের ডামাডোলে বুড়ি তিস্তার ওপর একটি সাধারণ সেতুর দাবি কেন বছরের পর বছর উপেক্ষিত থাকল, তার জবাব কে দেবে? আবদুল করিম যে তিন লাখ টাকা খরচ করে এই অসাধ্য সাধন করেছেন, তা রাষ্ট্রের বাজেটের তুলনায় অতি সামান্য। কিন্তু এই সামান্য কাজটি করার সদিচ্ছা কোনো জনপ্রতিনিধি বা দপ্তরের ছিল না। এটি প্রমাণ করে যে প্রান্তিক মানুষের দুঃখ–দুর্দশা অনেক সময় নীতিনির্ধারকদের নথিপত্র পর্যন্ত পৌঁছায় না।
এক কুলির মহানুভবতা ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব
আবদুল করিম একজন কুলি হতে পারেন, কিন্তু তাঁর চিন্তা ও দায়বদ্ধতা অনেক ক্ষমতাধরের চেয়ে উঁচুতে। নিজের তিল তিল করে জমানো ২৫ বছরের পুঁজি অন্যের কল্যাণে বিলিয়ে দেওয়ার জন্য যে বড় হৃদয়ের প্রয়োজন হয়, তা বিরল। ১৭ এপ্রিল তাঁর মায়ের হাত দিয়ে সেতুটি উদ্বোধন করার মাধ্যমে তিনি যে তৃপ্তি পেয়েছেন, তা হয়তো কোনো রাষ্ট্রীয় পদক দিয়েও পরিমাপ করা সম্ভব নয়।
তবে এ ঘটনার পর রাষ্ট্রের কি কোনো দায়িত্ব নেই? আবদুল করিম ব্যক্তি উদ্যোগে সেতুটি করেছেন বলেই কি সরকারের দায় শেষ হয়ে গেল? আমরা মনে করি, সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের মাধ্যমে নদীর সুরক্ষার বিষয়টি অগ্রাধিকার দিয়ে সেখানে একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের বিষয়টি বিবেচনা করা হোক। আমরা আবদুল করিমের এমন মহতি উদ্যোগের জন্য তাঁকে সাধুবাদ জানাই।



