ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালট: জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা ভারী, দুটি আসনের ফল বদল
পোস্টাল ব্যালটে জামায়াত এগিয়ে, দুটি আসনের ফল বদল

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালট: জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা ভারী, দুটি আসনের ফল বদল

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো প্রবর্তিত আইটি-সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালট পদ্ধতি রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রবাসী ভোটার, ভোটের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা ও আইনি হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা এই পদ্ধতিতে প্রদত্ত ভোটের বিশাল অংশই পেয়েছে বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। তবে একক দলের হিসাবে জামায়াতের ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকের পাল্লা অনেকটাই ভারী বলে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) চূড়ান্ত ফলাফল বিবরণী বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

পোস্টাল ভোটের পরিসংখ্যান: দাঁড়িপাল্লাই বেশি ভারী

সারাদেশের ৩০০ আসনে মোট পোস্টাল ভোটারের সংখ্যা ছিল ১৫ লাখ ২০ হাজার ৯৩ জন। এর মধ্যে ভোট দিয়েছেন ১০ লাখ ৬৩ হাজার ৮৭৪ জন, যার হার ৬৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ। এর মধ্যে বাতিল হয়েছে ৫৭ হাজার ৮৯৮ ভোট। পোস্টাল ব্যালটে দেশে ও প্রবাস থেকে দেওয়া ভোটের সিংহভাগই গিয়েছে বিএনপি ও জামায়াতের ঝুলিতে। এই দুটি দল মিলে পেয়েছে ৮ লাখ ১০ হাজার ২৫৮ ভোট, যা মোট প্রদত্ত ভোটের ৭৬ দশমিক ১৬ শতাংশ।

তবে একক দল হিসেবে দাঁড়িপাল্লাই বেশি ভারী। দলটি পেয়েছে পোস্টাল ভোটের ৪৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ ভোট, অর্থাৎ ৪ লাখ ৮৮ হাজার ১১৪ ভোট পেয়েছে দলটি। অপরদিকে বিএনপি পেয়েছে ৩০ দশমিক ২৮ শতাংশ ভোট, অর্থাৎ ৩ লাখ ২২ হাজার ১৪৪ ভোট। এছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) পেয়েছে ৫২ হাজার ৮৪০ ভোট— যা মোট ভোটের ৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই তিন দল মিলে পেয়েছে ৮ লাখ ৬৩ হাজার ১২৮ ভোট, যা মোট প্রদত্ত ভোটের ৮১ দশমিক ১৩ শতাংশ। অন্যান্য দলগুলো পেয়েছে বাকি ভোট।

সেক্ষেত্রে সংসদ নির্বাচনে ২০৯ আসনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করলেও পোস্টাল ভোটে এগিয়ে রয়েছে জামায়াত ইসলামী।

দুই আসনের ফলাফল পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে পোস্টাল ভোট

নির্বাচনের আগে থেকেই গুঞ্জন ছিল এবারের ভোটে ‘ট্রাম্প কার্ড’ হিসেবে কাজ করতে পারে পোস্টাল ভোট। যেকোনও মূহুর্তে ঘুরিয়ে দিতে পারে ফলাফল। এই গুঞ্জন পুরোপুরি সত্য না হলেও সারাদেশের মধ্যে দু’টি নির্বাচনি আসনের ফলাফলে পরিবর্তন আনে পোস্টাল ভোট। এই ভোটের ফলাফল সিরাজগঞ্জ-৪ ও মাদারীপুর-১ আসনের ফলাফল পরিবর্তনে ভূমিকা পালন করেছে বলে জানিয়েছে ইসি।

এই আসন দুটিতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং ১১ দলীয় জোট মনোনীত প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। সিরাজগঞ্জ-৪ আসনে কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফলে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী রফিকুল ইসলাম খান পেয়েছিলেন ১ লাখ ৫৯ হাজার ৬৯৩ ভোট এবং বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এম আকবর আলী পেয়েছিলেন ১ লাখ ৬০ হাজার ৪৫৮ ভোট। সে হিসেবে এগিয়ে ছিল বিএনপি প্রার্থী। তবে পোস্টাল ব্যালটের ভোট যুক্ত হওয়ার পর বিজয়ী হন জামায়াতের প্রার্থী। পোস্টাল ব্যালটের ফলাফল অনুযায়ী, ওই আসনে রফিকুল ইসলাম খান পেয়েছেন ২ হাজার ১৭৯ ভোট এবং এম আকবর আলী পেয়েছেন ৮২০ ভোট। চূড়ান্ত ফলাফলে জামায়াতের প্রার্থী ৫৯৪ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী ঘোষিত হন।

অপরদিকে মাদারীপুর-১ আসনে বিএনপির প্রার্থীর চেয়ে ৩৮৫ ভোট বেশি পেয়ে নির্বাচিত হন জামায়াত ইসলামী এবং ১১ দলীয় জোটের দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা। পোস্টাল ব্যালটের ফলাফল যুক্ত হওয়ার আগে কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফলে নাদিরা আক্তারের ভোট ছিল ৬৪ হাজার ২৯১ এবং হানাজালার ভোট ছিল ৬৩ হাজার ৫১১। অর্থাৎ, ভোটকেন্দ্রের ফলাফলে নাদিরা আক্তার এগিয়ে ছিলেন ৭৮০ ভোটে। পরবর্তীতে পোস্টাল ব্যালটে হানজালা পেয়েছেন ১ হাজার ৩৯৮ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী নাদির আক্তার পেয়েছেন ২৩৩ ভোট। ফলে চূড়ান্ত ভোটের হিসাবে ৩৮৫ ভোটে পিছিয়ে যায় বিএনপি প্রার্থী।

১৭২ আসনে ভোট পড়েছে ৭০ শতাংশের বেশি

পোস্টাল ব্যালটের ফলাফল বিবরণী বিশ্লেষণ করে জানা যায়, সারাদেশের ৩০০ আসনের মধ্যে ১৭২টি আসনে ভোট পড়েছে ৭০ শতাংশ বা এর বেশি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোট পড়েছে রংপুর-২ আসনে, ৮৭ দশমিক ০৮ শতাংশ। তবে পঞ্চগড়-২, ঠাকুরগাঁও-২, ঠাকুরগাঁও-৩ ও চট্টগ্রাম-১ আসনে পোস্টাল ভোট পড়ার হার ছিল শূন্য।

পোস্টাল ব্যালটে দলীয় প্রধানদের ভোটযুদ্ধ

ঢাকা-১৭ আসনে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান চূড়ান্ত ফলাফলের জয়ী হলেও পোস্টাল ব্যালটের ভোটে হয়েছেন পরাজিত। পোস্টাল ব্যালটের ভোটে তিনি পেয়েছেন ১ হাজার ২৫৬টি। অপরদিকে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী স. ম. খালিদুজ্জমান পেয়েছেন ২ হাজার ৩২৮ ভোট। সেক্ষেত্রে তারেক রহমানের থেকে ১ হাজার ৭২ ভোটে এগিয়ে ছিলেন খালিদুজ্জমান।

আবার বগুড়া-৬ আসনে চূড়ান্ত ভোটের ফলাফলে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এই আসনে পোস্টাল ব্যালটের ভোটেও বিজয়ী হয়েছেন তিনি। পোস্টাল ব্যালটে তিনি ভোট পেয়েছেন ১ হাজার ৫৪৫টি। আর তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. আবিদুর রহমান পেয়েছেন ১ হাজার ৬২ ভোট। অর্থাৎ পোস্টাল ব্যালটে ৪৮৩ ভোটে পিছিয়ে থেকে পরাজিত হয়েছেন জামায়াত প্রার্থী।

এদিকে ঢাকা-১৫ আসনে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান চূড়ান্ত ভোটের ফলাফলে বিজয়ী হয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি পোস্টাল ব্যালটের ভোটেও বিজয়ী হয়েছেন। পোস্টাল ব্যালটে তিনি ভোট পেয়েছেন ২ হাজার ৭৯০টি। অপদিকে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী মো. শফিকুল ইসলাম খান পেয়েছেন ১ হাজার ৯২০ ভোট। অর্থাৎ পোস্টাল ব্যালটে ৮৭০ ভোটে বিজয়ী হয়েছেন জামায়াত আমির।

আবার ঢাকা-১১ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম চূড়ান্ত ভোটের ফলাফলে বিজয়ী হয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি পোস্টাল ব্যালটের ভোটেও জয় পেয়েছেন। পোস্টাল ব্যালটে তিনি ভোট পেয়েছেন ১ হাজার ৮৩৪টি। আর তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী এম. এ কাইয়ুম পেয়েছেন ৮৬৪ ভোট। অর্থাৎ ৯৭০ ভোটে বিজয়ী হয়েছেন নাহিদ ইসলাম।

পোস্টাল ভোটের জয়-পরাজয়

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলে জয়ী হলেও পোস্টাল ব্যালটের ভোট যুদ্ধে পরাজিত হয়েছেন অনেকেই। আবার কেউ কেউ চূড়ান্ত ফলাফলে পরাজিত হলেও পোস্টাল ব্যালটের ভোটের হিসেবে এগিয়ে ছিল। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী এবং ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে চূড়ান্ত ভোটের ফলাফলে পরাজিত হলেও পোস্টাল ভোটে বড় ব্যবধানে এগিয়ে থাকে জামায়াতে ইসলামী। কুমিল্লা, চাঁদপুর, ফেনী, নোয়াখালী এবং চট্টগ্রাম জেলার আসনগুলোতে পোস্টাল ব্যালটের ফলাফলে এই চিত্র দেখা যায়।

এরমধ্যে কুমিল্লা জেলার ১১টি আসনের পোস্টাল ব্যালটের ফলাফলের প্রতিটিতেই জয়ী হয়েছেন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীরা। কুমিল্লা-৪ আসনে ১১ দলীয় জোটের শরিক ও এনসিপির প্রার্থী হাসনাত আব্দুল্লাহর সঙ্গে বিএনপি সমর্থিত গণঅধিকার পরিষদ মনোনীত প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান ৫ হাজার ৮১৫। এ আসনে চূড়ান্ত ফলাফলেও বিজয়ী হয়েছেন হাসনাত আব্দুল্লাহ। পোস্টাল ব্যালটে তিনি পেয়েছেন ৬ হাজার ৫৬ ভোট। আর তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী গণঅধিকার পরিষদের মো. আ. জসিম উদ্দিন পেয়েছেন ২৪১ ভোট।

চাঁদপুর, নোয়াখালী এবং লক্ষীপুর জেলার সবগুলো আসনেই ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীরা পোস্টাল ব্যালটে বিজয়ী হয়েছেন। এরমধ্যে চাঁদপুর জেলার ৫টি আসনের মধ্যে পোস্টাল ব্যালটে সর্বোচ্চ ভোটের হার রয়েছে চাঁদপুর-৩ আসনে। এই আসনে পোস্টালে ভোট পড়েছে ৭১ দশমিক ৫৯ শতাংশ। ওই আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. শাহজাহান মিয়ার সঙ্গে বিএনপির প্রার্থী শেখ ফরিদ আহম্মেদের ভোটের ব্যবধান ২ হাজার ২৬০টি। শাহজাহান মিয়া পেয়েছেন ৪ হাজার ৫৪ ভোট। আর শেখ ফরিদ আহম্মেদ পেয়েছেন ১ হাজার ৭৯৪ ভোট।

এদিকে পোস্টাল বিডি অ্যাপে সবচেয়ে বেশি নিবন্ধন করেছিল ফেনী-৩ আসনে। এই আসনে নিবন্ধন করেছিলেন ১৬ হাজার ৩৮ জন। এই আসনে বিএনপির প্রার্থী আব্দুল আউয়াল মিন্টু পোস্টাল ব্যালটে পেয়েছেন ৩ হাজার ১৯৬ ভোট। অপরদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ ফখরুদ্দিন পেয়েছেন ৭ হাজার ৩৩৯ ভোট। যদিও চূড়ান্ত ফলাফলে বিজয়ী হয়েছেন আব্দুল আউয়াল মিন্টু।

আবার চট্টগ্রাম জেলার ১৬টি আসনের মাত্র একটিতে পোস্টাল ব্যালটে জয় পেয়েছে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী। চট্টগ্রাম-১২ আসনে বিএনপি প্রার্থী মো. এনামুল হক পোস্টাল ব্যালটে ভোট পেয়েছেন ৯৬৪টি। আর তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর ফরিদুল আলম ভোট পেয়েছেন ৭৬৪ ভোট। অর্থাৎ পোস্টাল ভোটে ২০০ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন তিনি।