টাঙ্গাইল-১ আসনে ফকির মাহবুব আনামের জয়: দীর্ঘ সংগ্রামের পর মন্ত্রিসভায় স্থান
টাঙ্গাইল-১ আসনে ফকির মাহবুব আনামের জয় ও মন্ত্রিসভায় স্থান

টাঙ্গাইল-১ আসনে ফকির মাহবুব আনামের ঐতিহাসিক জয়: মন্ত্রিসভায় স্থান পাওয়ার গল্প

দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পর শেষ পর্যন্ত জয়ের দেখা পেয়েছেন ফকির মাহবুব আনাম (স্বপন)। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে টাঙ্গাইল-১ (মধুপুর-ধনবাড়ী) আসনে বিজয়ী হয়ে তিনি প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য হয়েছেন এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপির মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন। স্থানীয় বিএনপির নেতারা জানিয়েছেন, ফকির মাহবুব আনামকে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক শক্তি এবং নিজ দলের বিরোধী পক্ষের বৈরী আচরণের মুখোমুখি হতে হয়েছে; কিন্তু তিনি কখনো দমে যাননি। তিনি মধুপুরে এসেছিলেন মানুষের মন জয় করার জন্য, এবার তিনি সেই কাঙ্ক্ষিত জয় পেয়েছেন।

পরিবার ও রাজনৈতিক পটভূমি

টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার সন্তান ফকির মাহবুব আনামের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বেশ সমৃদ্ধ। তাঁর চাচা আফাজ উদ্দিন ফকির টাঙ্গাইল-২ (গোপালপুর-ভূঞাপুর) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ছিলেন। আরেক চাচা প্রখ্যাত গীতিকার লোকমান হোসেন ফকির। দলীয় নেতা–কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফকির মাহবুব আনাম তাঁর নিজ এলাকা টাঙ্গাইল-২ আসন থেকেই নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন; কিন্তু পরবর্তী সময়ে দলীয় নেতাদের পরামর্শে তিনি পার্শ্ববর্তী আসন টাঙ্গাইল-১ (মধুপুর-ধনবাড়ী) চলে যান। ২০০০ সালের দিকে মধুপুরে বাড়ি তৈরি করেন এবং মধুপুর ও ধনবাড়ীতে বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হন।

বিরোধ ও সংগ্রামের বছরগুলো

তবে স্থানীয় বিএনপির একটি অংশ তাঁর এই আসাকে ভালোভাবে নেননি। ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফকির মাহবুব আনাম বিএনপির মনোনয়ন পেলেও বিদ্রোহী প্রার্থী হন স্থানীয় বিএনপির নেতা আবদুল গফুর (মন্টু)। দলীয় ভোট ভাগ হওয়ায় তিনি পরাজিত হন। ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও দলীয় মনোনয়ন পান ফকির মাহবুব, কিন্তু জয়ী হতে পারেননি। ২০১৮ সালের নির্বাচনে এসে তিনি দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত হন, তারপরও তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন।

ত্রয়োদশ নির্বাচনে বিজয়

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফকির মাহবুব আনাম দলীয় মনোনয়ন পান; কিন্তু দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মোহাম্মদ আলী বিদ্রোহী প্রার্থী হন। দলের আরেক বহিষ্কৃত নেতা অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল আসাদুল ইসলামও প্রার্থী হন। শেষ পর্যন্ত মোহাম্মদ আলী নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ফকির মাহবুব ১ লাখ ৫৩ হাজার ৯৩২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আব্দুল্লাহেল কাফি পেয়েছেন ৯৪ হাজার ৪৬২ ভোট। এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে ৪৫ বছর পর আসনটি উদ্ধার করে বিএনপি।

স্থানীয় সমর্থন ও আদিবাসী সম্প্রদায়

মধুপুরের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সংগঠন জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জন জেত্রা বলেন, ফকির মাহবুব আনাম আদিবাসীবান্ধব একজন নেতা। তিনি ২৫ বছর ধরে মধুপুরে কাজ করছেন। আদিবাসীদের সব কর্মকাণ্ডে তিনি সঙ্গে থাকেন। এ জন্য ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষ দলমত–নির্বিশেষে তাঁকে ভোট দিয়েছেন। মধুপুর উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি রতন হায়দার বলেন, অনেক প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে ফকির মাহবুব আনাম মধুপুরে রাজনীতি করেছেন। তিনি মধুপুরের মানুষের মন জয় করে নিয়েছেন। মন্ত্রিসভায় স্থান পাওয়ায় তিনি এলাকার উন্নয়নে অনেক ভূমিকা রাখতে পারবেন।

আর্থিক অবস্থা ও হলফনামা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আয়কর রিটার্ন অনুযায়ী পেশায় ব্যবসায়ী ফকির মাহবুব আনামের মোট সম্পদের পরিমাণ ৩ কোটি ৯২ লাখ ৬৫ টাকা। তিনি বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ২২ লাখ ৭৭ হাজার টাকা। তাঁর স্ত্রী রেশমা আনামের সম্পদের পরিমাণ ২ কোটি ৫৮ লাখ ৮ হাজার টাকা, বার্ষিক আয় ১৩ লাখ ১১ হাজার ২৫০ টাকা। দুই সন্তানের সম্পদ রয়েছে যথাক্রমে ৭৯ লাখ ৮১ হাজার ও ৬৮ লাখ ২৮ টাকার সমপরিমাণ।