নেত্রকোনা-৫ আসনে বিএনপির হারের পেছনে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও অনিয়মের অভিযোগ
নেত্রকোনা-৫ (পূর্বধলা) আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাসুম মোস্তফা ২ হাজার ৭৬৫ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন। তিনি দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ৮২ হাজার ১৭৭ ভোট পেয়েছেন, অন্যদিকে বিএনপির প্রার্থী আবু তাহের তালুকদার ধানের শীষ প্রতীকে পান ৭৯ হাজার ৪১২ ভোট। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মো. নুরুল ইসলাম হাতপাখা প্রতীকে ৩ হাজার ৩৪১ ভোট পেয়েছেন।
বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও দলীয় বিভেদ
স্থানীয় বাসিন্দা ও দলীয় নেতা-কর্মীদের মতে, বিএনপির পরাজয়ের মূল কারণ হলো অভ্যন্তরীণ দলীয় কোন্দল। আসনটিতে বিএনপির মনোনয়ন পাওয়ার দৌড়ে ছিলেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য রাবেয়া আলী, পূর্বধলা উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক বাবুল আলম তালুকদার, সদস্যসচিব শহীদুল্লাহ ইমরানসহ পাঁচজন। আবু তাহের মনোনয়ন পাওয়ার পর শুধু বাবুল আলম তালুকদার প্রকাশ্যে তাঁর পক্ষে অবস্থান নেন, অন্যরা নীরব ভূমিকা পালন করেন। তৃণমূল নেতা-কর্মীরা বলছেন, দলীয় ঐক্যের অভাবই আবু তাহেরের পরাজয় ডেকে এনেছে।
নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগ ও ভোট পুনর্গণনার দাবি
আবু তাহের তালুকদার দাবি করেছেন, তাঁর আসনে নির্বাচনী অনিয়ম, ভোট বাতিল, প্রিসাইডিং কর্মকর্তাসহ দায়িত্ব পালনকারীদের ওপর জামায়াতের প্রার্থীর প্রভাব বিস্তারসহ বিভিন্ন কারচুপি হয়েছে। এ কারণে তিনি ফলাফল স্থগিত করে সব ভোট পুনর্গণনার দাবি জানিয়েছেন। গত শনিবার সন্ধ্যায় পূর্বধলা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে তিনি এই অভিযোগ তুলে ধরেন এবং সোমবার উচ্চ আদালতে আপিল করেছেন বলে জানিয়েছেন।
ভোটার সংখ্যা ও ভোটের হার
রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১১টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত আসনটির ভোটারসংখ্যা ২ লাখ ৯০ হাজার ১৭৭। ৮২টি কেন্দ্রে ভোট পড়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৮৬৮টি, যার মধ্যে ৩ হাজার ৯৩৮টি ভোট বাতিল হয়েছে। বৈধ ভোটের সংখ্যা ১ লাখ ৬৪ হাজার ৯৩০, অর্থাৎ ভোট পড়েছে ৫৮ দশমিক ২১ শতাংশ।
বিএনপির ঐতিহাসিক অবস্থান ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ
স্বাধীনতার পর থেকে নেত্রকোনা-৫ আসনটি আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির দখলে ছিল, তবে বেশির ভাগ সময় আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিজয়ী হন। ২০০১ সালে বিএনপির প্রার্থী প্রয়াত চিকিৎসক মোহাম্মদ আলী এমপি হওয়ার পর এ আসনে বিএনপি থেকে আর কেউ এমপি হতে পারেননি, টানা চারবার আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জয়ী হন। এবার বিএনপির শক্ত অবস্থান থাকলেও জামায়াতের প্রার্থীর কাছে হেরে যান আবু তাহের।
স্থানীয় নেতাদের বিশ্লেষণ ও প্রতিক্রিয়া
উপজেলা বিএনপির সাবেক একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, 'শহীদুল্লাহ ইমরানসহ কয়েকজন নেতা দলীয় প্রার্থীর বিরোধিতা করায় সুযোগ কাজে লাগিয়ে জামায়াতের প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। এটা আমাদের জন্য লজ্জাজনক।' আরেক পদধারী সাবেক নেতা যোগ করেন, 'দলীয় প্রার্থীর কিছু কর্মীর বিরুদ্ধে অপরাধমূলক কাজের কথা ছড়িয়ে পড়ায় তা বিজয়ে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। জামায়াতের প্রার্থী শক্তিশালী হওয়ায় দলীয় প্রার্থী অহংকারী হয়ে পড়েন, যা পরাজয়ের আরেক কারণ।'
বিজয়ী প্রার্থীর পরিচয় ও বক্তব্য
বিজয়ী প্রার্থী মাসুম মোস্তফা জেলা জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি এবং পূর্বধলার হাফেজ জিয়াউর রহমান ডিগ্রি কলেজের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। তিনি বলেন, 'আমি সব সময় অহিংস ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে বিশ্বাসী। পূর্বধলাবাসীর অব্যাহত ভালোবাসায় এবারও আমাকে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ দিয়েছেন।'
রিটার্নিং কর্মকর্তার প্রতিক্রিয়া
নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. সাইফুর রহমান দাবি করেন, 'কোনো কারচুপি হয়নি। রেজাল্ট হয়ে গেছে, সব স্বাক্ষর হয়ে গেছে, এখন এসব কেন প্রশ্ন আসছে?'
এদিকে, বিএনপির নেতারা পরাজয়ের কারণ চিহ্নিত করে উত্তরণের পথ খুঁজছেন। জেলা বিএনপির সভাপতি মো. আনোয়ারুল হক বলেন, 'বিষয়টি আমাদের ভাবিয়ে তুলছে। কেন এমন হলো, কোথায় আমাদের দুর্বলতা ছিল, তার কারণ চিহ্নিত করা হচ্ছে।'
