রংপুরে বিএনপির নির্বাচনি বিপর্যয়: দলীয় কোন্দল ও জামায়াতের কৌশলী পদক্ষেপ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর বিভাগে বিএনপির প্রত্যাশিত জয়ের সম্ভাবনা সম্পূর্ণভাবে ভরাডুবি হয়েছে। জামায়াত ইসলামী দলটি এই অঞ্চলের ৬টি আসনে জয়লাভ করে নির্বাচনি ইতিহাস তৈরি করেছে। দেশ স্বাধীনতার পর থেকে সংসদ নির্বাচনে কোনো আসনে জয়লাভ করতে না পারা জামায়াতের এই সাফল্য রংপুরের সাধারণ ভোটার ও সুধী মহলে ব্যাপক হতবাকতার সৃষ্টি করেছে।
দলীয় কোন্দল ও এনজিওর ভূমিকা
বিএনপির অভ্যন্তরীণ দলীয় কোন্দল এবং জামায়াতের একাধিক বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) ব্যবহারের কৌশল এই ফলাফলের পেছনে মুখ্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। জামায়াত ভোটের আগে থেকেই বিভিন্ন এনজিওকে তাদের দলের প্রচারণার কাজে মাঠে নামিয়েছিল। এসব সংস্থা ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্প ও বিভিন্ন খাতে আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে থাকে।
তারা বিশেষভাবে গ্রামীণ অশিক্ষিত ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে টার্গেট করে জামায়াতের সদস্য বানানোর শর্তে আর্থিক সুবিধা প্রদান করেছে। গ্রামীণ নারীদেরকে বেশি হারে সদস্য করা হয়েছে এই প্রক্রিয়ায়। এছাড়াও অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রিসাইডিং অফিসার হিসেবে এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাসহ অনুগত আনসার ও পুলিশ সদস্যদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
বিএনপি নেতাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া
এ নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে প্রকাশ্যে তীব্র অভিযোগ করেছেন বিএনপির তিন পরাজিত প্রার্থী। রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ) আসনের সাইফুল ইসলাম, রংপুর-৩ (সদর-সিটি আংশিক) আসনের সামসুজ্জামান সামু এবং রংপুর-৪ (কাউনিয়া-পীরগাছা) আসনের এমদাদুল হক ভরসা নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত ও জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে রংপুর জেলা প্রশাসক, ডিআইজি, মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ও পুলিশ সুপারকে দায়ী করেছেন।
রোববার জেলা প্রশাসকের দপ্তর ঘেরাও করে তিন প্রার্থীসহ দলের নেতাকর্মীরা পুনরায় ভোট গণনার দাবি জানিয়েছেন। রংপুর-৬ আসনে সোমবার পীরগঞ্জের হাসারপাড়া প্রাইমারি স্কুল ভোট কেন্দ্রে বিপুলসংখ্যক ধানের শীষের সিল মারা ব্যালট পেপার পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে, যা অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করেছে।
বিভিন্ন আসনের বিস্তারিত পরিস্থিতি
রংপুর-৫ মিঠাপুকুর আসনে সবচেয়ে বেশি ভোটার সংখ্যা থাকলেও বিএনপির দলীয় কোন্দল ভোটের মাঠে স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়নি। তবে এই আসনে জামায়াতের দলীয় একাধিক এনজিও সক্রিয়ভাবে কাজ করেছে এবং আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে সদস্য সংগ্রহ করে ভোট বাড়িয়েছে।
রংপুর-৪ আসনে প্রার্থী এমদাদুল হক ভরসা তার পরাজয়ের জন্য জামায়াতের পক্ষে ভোট কারচুপির সঙ্গে জড়িত রিটার্নিং কর্মকর্তাসহ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের দায়ী করেছেন।
রংপুর-৩ আসনে বিএনপির মহানগর কমিটির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট মাহফুজ-উন-নবী ডন মনোনয়ন না পাওয়ায় দলের প্রার্থীর পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেননি। তার অনুসারী যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরাও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারেননি।
রংপুর-২ (তারাগঞ্জ-বদরগঞ্জ) আসনে সংখ্যালঘু ভোটার বেশি থাকা সত্ত্বেও বিএনপি প্রার্থী মোহাম্মদ আলী সরকারের জন্য তা কাজে আসেনি। এই আসনে দলীয় কোন্দল চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল, যার মারাত্মক বিরূপ প্রভাব ভোটের ফলাফলে পড়েছে। মনোনয়ন প্রত্যাশী পরিতোষ চক্রবর্তী ও আজিজুল হক দলের প্রার্থীর বিপক্ষে সক্রিয় ছিলেন।
রংপুর-১ (সদর-সিটি আংশিক) আসনে দলের প্রার্থীর দুর্বলতা এবং জামায়াতের এনজিওগুলোর কার্যকরী ভূমিকা পরাজয়ের কারণ হয়েছে। গংগাচড়া উপজেলার ৭টি ইউনিয়ন তিস্তা নদীর চরাঞ্চল ও নদী ভাঙনপ্রবণ এলাকা হওয়ায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে আর্থিক সুবিধা দিয়ে প্রভাবিত করা জামায়াতের জন্য সহজ হয়েছে।
সামগ্রিক বিশ্লেষণ
জামায়াত সফলভাবে বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতা ও দলীয় কোন্দলকে কাজে লাগিয়েছে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে আর্থিক ঋণ সহায়তা ও ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে দলের সদস্য বানানোর এই কৌশলী পদক্ষেপ নির্বাচনি সাফল্যের দিকে নিয়ে গেছে। একই সাথে প্রশাসনিক পর্যায়ে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে ভোটের দিন জামায়াতের পক্ষে কাজ করা হয়েছে বলে বিএনপি নেতাদের দাবি।
এই নির্বাচনি ফলাফল রংপুরের রাজনৈতিক সমীকরণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে এবং ভবিষ্যত রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় এনজিওগুলোর ভূমিকা নিয়ে নতুন বিতর্কের সূচনা করেছে।
