ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া জেলার সাতটি আসনেই বিএনপি নেতারা বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেছেন। দলীয় চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে এই বিজয়ে চারজন নতুন মুখ সংসদে প্রবেশ করছেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, এই চারজনের মধ্যে তিনজনই পূর্বে বিভিন্ন উপজেলার চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাদের নির্বাচনী সাফল্য বিএনপির জন্য একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বগুড়া-২ আসনে মীর শাহে আলমের জয়
বগুড়া-২ আসনটি শিবগঞ্জ উপজেলা পরিষদ নিয়ে গঠিত। এই আসন থেকে জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ও শিবগঞ্জ উপজেলা শাখার সভাপতি মীর শাহে আলম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি ২০০৯ সালে শিবগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং বিসিক ও বিআরটিসির পরিচালকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ১ লাখ ৪৫ হাজার ২৪ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর সাবেক মেয়র আবুল আজাদ মোহাম্মদ শাহাদুজ্জামান পেয়েছেন ৯৩ হাজার ৫৪৮ ভোট।
মীর শাহে আলম তার বিজয়ের পর জানিয়েছেন, সংসদে গিয়ে তিনি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে রাষ্ট্র মেরামতে ৩১ দফার বাস্তবায়নে সহযোগিতা করবেন। পাশাপাশি, তিনি তার আসনটিকে উন্নয়নের মডেল উপজেলা হিসেবে গড়ে তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি উল্লেখ করেন যে, উপজেলা চেয়ারম্যানের চেয়ে সংসদ সদস্য হিসেবে উন্নয়ন কাজে অনেক বড় ভূমিকা রাখতে পারবেন।
বগুড়া-৩ আসনে আবদুল মুহিত তালুকদারের সাফল্য
বগুড়া-৩ আসনটি দুপচাঁচিয়া ও আদমদীঘি উপজেলা নিয়ে গঠিত। আদমদীঘি উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল মুহিত তালুকদার ২০১৪ সালে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এই আসনে তার পরিবারের একটি রাজনৈতিক ঐতিহ্য রয়েছে। তার বাবা আবদুল মজিদ তালুকদার তিনবার এবং বড় ভাই আবদুল মোমেন তালুকদার খোকা দুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে এই আসনে আবদুল মোমেন তালুকদার খোকার স্ত্রী মাসুদা মোমেনকে প্রার্থী করা হয়েছিল, কিন্তু তিনি জাতীয় পার্টির প্রার্থী নুরুল ইসলাম তালুকদারের কাছে পরাজিত হন।
এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আবদুল মুহিত তালুকদার ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ২৭ হাজার ৪০৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর নূর মোহাম্মদ পেয়েছেন ১ লাখ ১১ হাজার ২৬ ভোট। আবদুল মুহিত তালুকদার জানিয়েছেন যে, তিনি বগুড়া-৩ আসনের আদমদীঘি ও দুপচাঁচিয়া উপজেলার কাঙ্ক্ষিত সব উন্নয়ন কাজ করার চেষ্টা করবেন।
বগুড়া-৭ আসনে মোরশেদ মিল্টনের ঐতিহাসিক বিজয়
বগুড়া-৭ আসনটি গাবতলী ও শাজাহানপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত। গাবতলীর বাগবাড়ি গ্রামে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জন্মস্থান। এই এলাকায় ১৯৯১ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত সব নির্বাচনে বিএনপির চেয়ারপারসন প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া বিপুল ভোটে নির্বাচিত হতেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে মনোনয়ন দাখিল করা হয়েছিল। নেত্রীর মৃত্যুর পর জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ও গাবতলী উপজেলা বিএনপির সভাপতি মোরশেদ মিল্টনকে ধানের শীষের প্রার্থী করা হয়। তিনি ২ লাখ ৬২ হাজার ৫০১ ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর গোলাম রব্বানী পেয়েছেন ১ লাখ ১৫ হাজার ৫৮৪ ভোট।
মোরশেদ মিল্টনের রাজনৈতিক পটভূমি
এমপি হওয়ার আগে মোরশেদ মিল্টন গাবতলী পৌরসভার মেয়র ও পরে গাবতলী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে তাকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তার উপজেলা পরিষদের পদ থেকে পদত্যাগ গৃহীত না হওয়ায় সেবার বিএনপি প্রার্থী ছাড়াই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই বছর বিএনপির সমর্থনে রেজাউল করিম বাবলু নামে এক ব্যক্তি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ট্রাক মার্কা প্রতীকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
মোরশেদ মিল্টন তার বিজয়ের পর বলেন, ভোটাররা বিপুল ভোটে তাকে নির্বাচিত করে জিয়া পরিবারের মর্যাদা রেখেছেন। তিনি তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব সততার সঙ্গে পালনের মাধ্যমে জিয়া পরিবারের এই আসনের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখবেন বলে আশা প্রকাশ করেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়ার এই তিন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যানের বিজয় বিএনপির জন্য একটি শক্তিশালী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তাদের স্থানীয় সরকারের অভিজ্ঞতা সংসদে উন্নয়ন কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
