বন্ড সুবিধা পাবে সব রপ্তানিকারক: অর্থমন্ত্রী
সব রপ্তানিকারকের জন্য বন্ড সুবিধা খোলা: অর্থমন্ত্রী

ঢাকা ফোরাম ইনিশিয়েটিভ (ডিএফআই) আয়োজিত এক প্রাক্‌-বাজেট আলোচনায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি জানান, তৈরি পোশাকের পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হওয়া যেকোনো পণ্যের ক্ষেত্রেই বন্ডেড ওয়্যারহাউস (শুল্কমুক্ত গুদাম) সুবিধা দেওয়া হবে। একই সঙ্গে বন্ড সুবিধা পাওয়া ব্যবসায়ীদের হয়রানি বন্ধ এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানোরও ঘোষণা দেন তিনি।

প্রাক্‌-বাজেট আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা

আজ বুধবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বনানীর একটি হোটেলে ঢাকা ফোরাম ইনিশিয়েটিভ (ডিএফআই) আয়োজিত এক প্রাক্‌-বাজেট আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গনি এবং বিএনপির পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির সদস্য ইসরাফিল খসরু। ঢাকা ফোরাম ইনিশিয়েটিভের প্রধান কৌশলবিদ আশফাক জামানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন খাতের নতুন প্রজন্মের ব্যবসায়ীরা বক্তব্য দেন।

বন্ডেড ওয়্যারহাউসে সহজীকরণ

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বন্ডেড ওয়্যারহাউস নিয়ে কোনো ধরনের হয়রানি আর বরদাশত করা হবে না। নিয়মকানুন সহজ করা হচ্ছে এবং বাংলাদেশ থেকে যেকোনো পণ্য রপ্তানি করেন—এমন যে কাউকেই বন্ডেড ওয়্যারহাউস ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হবে। এই সুবিধা কোনো নির্দিষ্ট খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। পোশাক খাতের পাশাপাশি স্বর্ণালংকার ও হীরা কাটা (ডায়মন্ড কাটিং) শিল্পের মতো সম্ভাবনাময় খাতের রপ্তানিকারকেরাও ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি (এলসি) সুবিধার আওতায় বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা পাবেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বন্ড লাইসেন্স নবায়নে পরিবর্তন

ব্যবসা পরিচালনা সহজ করার অংশ হিসেবে বন্ড লাইসেন্স নবায়ন প্রক্রিয়াতেও পরিবর্তনের ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের প্রতিবছর বন্ড লাইসেন্স নবায়নের প্রয়োজন হবে না। এ ছাড়া প্রতিবছর অডিট করার নিয়ম তুলে দিয়ে তিন বা পাঁচ বছর পরপর অডিটের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

বিরোধিতা সত্ত্বেও এগিয়ে যাওয়া

সব রপ্তানিকারকের জন্য বন্ড সুবিধা চালুর ক্ষেত্রে বিভিন্ন মহলের বিরোধিতার কথা উল্লেখ করে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এর পেছনে অনেক বাধা রয়েছে। তবে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, কোনো অজুহাত চলবে না। যাঁরা পণ্য রপ্তানি করবেন, তাঁরা কোনো ট্যারিফ বা শুল্ক ছাড়াই এই সুবিধা পাবেন।

বাংলাদেশকে ব্যবসার সেরা গন্তব্য করার প্রত্যয়

বাংলাদেশকে বিনিয়োগ ও ব্যবসার জন্য বিশ্বের অন্যতম সেরা গন্তব্যে পরিণত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনা বিশ্বের সবচেয়ে সহজ ব্যবস্থাগুলোর একটি হবে। ‘ব্যবসার জন্য বাংলাদেশ ২৪ ঘণ্টা, ৭ দিন উন্মুক্ত’—এটাই সরকারের মূল বার্তা।

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, শুধু বাজেট বক্তৃতায় ঘোষণা দিলেই ডিরেগুলেশন বাস্তবায়িত হবে না। এতে অনেক বাধা আসবে। অনেকের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হবে। এরপরও সরকার সব বাধা অতিক্রম করে এগিয়ে যাবে।

করব্যবস্থায় ডিজিটালাইজেশন

করব্যবস্থায় দুর্নীতির প্রসঙ্গ তুলে অর্থমন্ত্রী বলেন, সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হয় ট্যাক্সেশনে। এ কারণে করব্যবস্থাকে ডিজিটাল করার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বন্দরে পণ্য আসা থেকে খালাস হওয়া পর্যন্ত ব্যবসায়ীদের যে অতিরিক্ত ব্যয় হয়, তা কমিয়ে আনা সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।

চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়ন

চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের দাবির প্রসঙ্গ টেনে অর্থমন্ত্রী বলেন, পণ্যের রাসায়নিক বা কেমিক্যাল পরীক্ষার জন্য আর ঢাকার ল্যাবরেটরির ওপর নির্ভর করতে হবে না। এই দায়িত্ব চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্সকে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বন্দরে পণ্য খালাসে বাধা হয়ে থাকা স্ক্যানিং মেশিনের কাজও করবে চট্টগ্রাম চেম্বার।

থিয়েটার ডিস্ট্রিক্ট গড়ার পরিকল্পনা

বিনোদন ও সংস্কৃতির বাণিজ্যিক বিকাশে ঢাকার কাছাকাছি ১৬০ একর জমিতে একটি ‘থিয়েটার ডিস্ট্রিক্ট’ গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান অর্থমন্ত্রী। সেখানে থিয়েটার, স্ট্যান্ডআপ কমেডি, ডিজাইনার ও পেইন্টারদের জন্য সুযোগ থাকবে।

ব্যবসায়ীদের মতামত

অনুষ্ঠানে ট্রান্সকমের গ্রুপ সিইও সিমিন রহমান বলেন, স্বচ্ছ কর আদায়–ব্যবস্থার অভাবে নিয়ম মেনে চলা কোম্পানিগুলোর ওপর করের বোঝা বাড়ছে। ভ্যাট–ব্যবস্থা সহজ করার পাশাপাশি পুরো শিল্প খাতে অভিন্ন ভ্যাটহার চালুর প্রয়োজন রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘আমলাতান্ত্রিক লালফিতার দৌরাত্ম্য এবং জটিল করনীতি বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণে বড় বাধা। বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী বিদেশি কোম্পানিগুলোর মূল উদ্বেগ থাকে এই জায়গায়। আমরা যত দ্রুত ও সহজে এই বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করব, এফডিআই তত উৎসাহিত হবে।’

সিমিন রহমান আরও বলেন, ‘কোম্পানিগুলোর জন্য পুঁজিবাজারে যাওয়ার পেছনে বড় কোনো প্রণোদনা বা সুবিধা নেই। আমাকে যখন একাধিকবার ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে নিয়ে আসার কথা বলা হয়েছিল, তখন আমি সেখানে বিশেষ কোনো সুবিধা দেখতে পাইনি। উল্টো সেখানে যে ধরনের কারসাজি (ম্যানিপুলেশন) হতে পারে, তা নিয়ে আমি বেশ শঙ্কিত ছিলাম। আর এই বিষয়টিই আমাকে কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত করেছে। অথচ বড় কোম্পানিগুলোর পুঁজিবাজারে আসা উচিত।’

আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসনে কাজ

প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গনি বলেন, উদ্যোক্তারা ব্যবসা শুরু করার আগেই আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ক্লান্ত হয়ে পড়েন। বিষয়টি সহজ করতে গত দুই মাসে ব্যাপক কাজ হয়েছে এবং আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ডিরেগুলেশন–সংক্রান্ত বেশ কিছু ঘোষণা আসবে।

বিএনপির পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির সদস্য ইসরাফিল খসরু বলেন, পুঁজি ও মুনাফা দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার সীমা ১০ হাজার ডলার থেকে বাড়িয়ে প্রায় ১০ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

অনন্ত গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শরীফ জহির বলেন, সুতি পণ্যে দীর্ঘদিন ধরে দেওয়া নগদ প্রণোদনার নীতি পুনর্বিবেচনার সময় এসেছে। পোশাক খাতের টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য কৃত্রিম বা ম্যান-মেড ফাইবারে বিশেষ প্রণোদনা এবং বন্ড লাইসেন্স প্রাপ্তির প্রক্রিয়া দুর্নীতিমুক্ত ও সহজ করা প্রয়োজন।