খুলনা-২ আসনে বিএনপির ঐতিহাসিক পরাজয়: জামায়াতের বিজয়ে রাজনৈতিক সমীকরণ বদল
খুলনা-২ (সদর-সোনাডাঙ্গা) আসন, যা দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির অভেদ্য দুর্গ হিসেবে পরিচিত ছিল, এবার প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর দখলে চলে গেছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে অল্প ব্যবধানে পরাজিত করে জয়ী হয়েছেন জামায়াতের খুলনা মহানগর সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট শেখ জাহাঙ্গীর হোসেন হেলাল।
বিএনপির দীর্ঘদিনের আধিপত্য ভেঙে যাওয়া
১৯৯১ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত প্রতিটি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনে খুলনা-২ আসন ছিল বিএনপির দখলে। এমনকি ২০০৮ সালের রাজনৈতিক বিপর্যয়ের সময়েও মঞ্জু এই আসনে জয়ী হয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের শাসনামলেও তিনি ওয়ান ম্যান আর্মি হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং জনপ্রিয়তায় অনন্য স্থান ধরে রেখেছিলেন।
পরাজয়ের মূল কারণ: আত্মতৃপ্তি ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল
রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং বিএনপির নিজস্ব নেতাকর্মীদের মতে, এই পরাজয়ের পেছনে প্রধানত দুটি কারণ কাজ করেছে:
- অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস: এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতির কারণে মঞ্জু এবং তার অনুসারীদের মধ্যে এক ধরনের আত্মতৃপ্তি তৈরি হয়েছিল। প্রার্থী ঘোষণার পরও প্রথম দিকে তিনি সক্রিয়ভাবে নির্বাচনি কার্যক্রম চালাননি।
- দলীয় গ্রুপিং: ২০২১ সালে খুলনা মহানগর বিএনপির কমিটি ভেঙে দেওয়ার পর থেকে মঞ্জুর সঙ্গে দলের বর্তমান নেতৃত্বের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়। নির্বাচনের সময়েও এই কোন্দল মিটেনি, ফলে অনেক প্রভাবশালী নেতা তার পক্ষে জোরালোভাবে মাঠে নামেননি।
জামায়াতের কৌশলগত বিজয়
অন্যদিকে, জামায়াত প্রার্থী হেলাল পরিকল্পিত ও কৌশলী প্রচারণা চালিয়েছেন। দলটির কর্মীরা ঘরে ঘরে গিয়ে প্রচার চালায়, বিশেষ করে নারী ভোটারদের নিয়ে আসতে বিশেষ উদ্যোগ নেয়। বিএনপির প্রচারণা মূল সড়ক ও বাজারকেন্দ্রিক থাকলেও জামায়াত অলিগলি পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
জামায়াত কর্মী জিকু আলম জানান, বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের সুযোগ আমরা কাজে লাগিয়েছি। ছোট ছোট ইউনিটে ভাগ হয়ে পাড়া-মহল্লাভিত্তিক কাজ করেছি, যা ভোটার উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে।
স্থানীয় প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, এ আসনে এবার তুলনামূলক ভোট কম পড়েছে। বিএনপির অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতা ভোটের ফলে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি শফিকুল আলম বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, এখনো বুঝে উঠতে পারছি না কেন হারলাম। হিসাব মিলছে না।
জামায়াতের এই জয় দলটিকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে এবং তারা আগামীতে এই আসনকে নিজেদের অনুকূলে আরও গ্রহণযোগ্য করে গড়ে তুলতে কাজ করছে।
