রুমিন ফারহানা: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রথম নারী সরাসরি সংসদ সদস্য হিসেবে ঐতিহাসিক জয়
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় প্রথম নারী সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ইতিহাস গড়লেন রুমিন ফারহানা: প্রথম নারী সরাসরি সংসদ সদস্য

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের আংশিক) আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন রুমিন ফারহানা। শুক্রবার দুপুরে সরাইল উপজেলার শাহবাজপুর গ্রামে কর্মী ও সমর্থকরা তাঁকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেন। এই জয়ে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা থেকে প্রথমবারের মতো কোনো নারী সরাসরি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন। এর আগে একাদশ জাতীয় সংসদে তিনি সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য ছিলেন।

ভোটের ফলাফল ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা

নির্বাচনে হাঁস প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে রুমিন ফারহানা পেয়েছেন ১ লাখ ১৮ হাজার ৫৪৭ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ–সমর্থিত প্রার্থী মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব, যিনি খেজুরগাছ প্রতীকে পেয়েছেন ৮০ হাজার ৪৩৪ ভোট। এই ফলাফল তাঁর জনপ্রিয়তা ও মাঠের শক্তিরই প্রমাণ বহন করে।

নারী প্রার্থীদের অবস্থা ও রুমিন ফারহানার আলাদা পরিচয়

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জাতীয় সংসদের ছয়টি আসনের মধ্যে এবারের নির্বাচনে চারজন নারী প্রার্থী অংশ নেন। রুমিন ফারহানা ছাড়া অন্য নারী প্রার্থীরা হলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে আমজনতার দলের শরিফা আক্তার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনে ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের প্রার্থী আশেয়া আক্তার এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ আসনে গণসংহতি আন্দোলনের প্রার্থী নাহিদা জাহান। তবে তাঁরা কেউই উল্লেখযোগ্য ভোট পাননি এবং জামানত হারানোর মুখে পড়েছেন।

সারা দেশে এবার ৮৬ জন নারী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, যাঁদের মধ্যে বিজয়ী হন মাত্র ৭ জন। বিজয়ীদের মধ্যে ৬ জন ছিলেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী, আর শুধু স্বতন্ত্র হিসেবে জয়ী হন রুমিন ফারহানা। এই বৈশিষ্ট্য তাঁকে আলাদা করে আলোচনায় এনেছে।

রাজনৈতিক পটভূমি ও জনপ্রিয়তা

বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগ থেকেই মাঠে সক্রিয় ছিলেন রুমিন ফারহানা। দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হন, যার ফলে তিনি দলীয় পদ হারান এবং দল থেকে বহিষ্কৃত হন। তবে মাঠপর্যায়ে নেতা-কর্মী ও সাধারণ ভোটারদের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল উল্লেখযোগ্য, যা এই জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

রাজনৈতিকভাবে এই আসনের সঙ্গে রুমিন ফারহানার পারিবারিক ইতিহাসও জড়িত। তাঁর বাবা ভাষাসংগ্রামী অলি আহাদ ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন, যদিও পরে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছিল নৌকা প্রতীকের প্রার্থী তাহের উদ্দিন ঠাকুরকে।

পূর্ববর্তী নির্বাচনের প্রেক্ষাপট

এই জেলায় দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা হুমায়ুন কবীরের স্ত্রী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভার সাবেক মেয়র নায়ার কবীর। বিতর্কিত ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জোটের শরিক জাপার জিয়াউল হক মৃধা ৩৭ হাজার ৫০৮ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছিলেন, যেখানে নায়ার কবীর পেয়েছিলেন ৩০ হাজার ৪৬ ভোট। এবারের নির্বাচনে রুমিন ফারহানার জয় এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

রুমিন ফারহানার এই সাফল্য শুধু ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জন্যই নয়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নারী প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হবে।