নির্বাচনে জামায়াতের ঐতিহাসিক উত্থান: বিএনপির বিজয়ে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ
নির্বাচনে জামায়াতের উত্থান: বিএনপির বিজয়ে নতুন সমীকরণ

নির্বাচনে জামায়াতের ঐতিহাসিক উত্থান: বিএনপির বিজয়ে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ

শীত বিদায়ের মিষ্টি রোদ ও মৃদুমন্দ বাতাসের দিন ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি সন্ধিক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত হবে। ভোটাররা উৎসবের আমেজে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন, যার ফলশ্রুতিতে নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে ভোট প্রদানের হার দাঁড়িয়েছে ৫৯.৪৪ শতাংশ। আওয়ামী লীগ–বিহীন এই নির্বাচনে ভোটের হার নিঃসন্দেহে আশাপ্রদ, যদিও ২০০৮ সালের ৮৭ শতাংশ ও ২০০১ সালের ৭৬ শতাংশ ভোটার অংশগ্রহণের তুলনায় এটি কিছুটা কম।

সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে চ্যালেঞ্জ ও সাফল্য

গত ১৮ মাসের অন্তর্বর্তী সরকারের দুর্বল শাসন ও মব সহিংসতার মুখে সরকারের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও শেষবেলায় একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব হয়েছে। ১৭ বছর ভোট দিতে না পারা নাগরিকদের প্রবল আকাঙ্ক্ষা, রাজনৈতিক দলগুলোর সংযত আচরণ এবং নির্বাচন কমিশনের কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। প্রায় ১ লাখ ৮ হাজার সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যের তৎপরতা ভয়হীন ভোটিং পরিবেশ নিশ্চিত করেছে, যা গণতন্ত্রের জন্য একটি ইতিবাচক সংকেত।

বিএনপির ঐতিহাসিক বিজয় ও জামায়াতের উত্থান

২৯৭টি আসনের ফলাফলে বিএনপি এককভাবে ২০৯টি আসনে জয়ী হয়ে দলটির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিজয় অর্জন করেছে, যা ১৯৭৯ সালের ২০৭টি আসনের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। তবে এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো জামায়াতে ইসলামীর অভূতপূর্ব সাফল্য। দলটি এককভাবে ৬৮টি ও জোটগতভাবে ৭৬টি আসনে জয়ী হয়েছে, যা ১৯৯১ সালের ১৭টি, ২০০১ সালের ১৫টি ও ২০০৮ সালের ২টি আসনের তুলনায় বিশাল উল্লম্ফন। ভোটারদের প্রায় ৩২ শতাংশ সমর্থন জামায়াতকে এনে দিয়েছে, যেখানে বিএনপি পেয়েছে ৪৯.৬০ শতাংশ।

আঞ্চলিক বিশ্লেষণ ও রাজনৈতিক মেরুকরণ

জামায়াতের সাফল্য বিশেষভাবে লক্ষণীয় খুলনা, রংপুর ও রাজশাহী বিভাগে। খুলনার ৩৬টি আসনের মধ্যে ২৫টি, রংপুরের ৩৩টির মধ্যে ১৬টি এবং রাজশাহীর ৩৯টির মধ্যে ১১টি আসনে জামায়াত জয়ী হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভারতীয় সীমান্তসংলগ্ন এসব অঞ্চলে দেশভাগ–পরবর্তী মাইগ্রেটেড জনগোষ্ঠীর ভোট প্রভাব ফেলতে পারে। উত্তরবঙ্গে জাতীয় পার্টির ভোটারদের একটি বড় অংশ জামায়াতের দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে এবার একটি আসনেও জিততে দেয়নি।

ঢাকায় জামায়াতের অভাবনীয় সাফল্য

ঢাকা মহানগরের ১৫টি আসনের মধ্যে ৬টিতে জামায়াত জোটের জয় সবচেয়ে বিস্ময়কর, কারণ অতীতে দলটি ঢাকার কোনো আসনই জিততে পারেনি। তরুণ ভোটারদের সমর্থন, বিএনপির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ এবং ভোটার স্থানান্তরের কৌশল এ ক্ষেত্রে কাজ করেছে। রিকশাচালক, সিএনজিচালক ও ফুটপাতের দোকানিদের জামায়াতপন্থী প্রচারণা দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

নারী, সংখ্যালঘু ও বামপন্থীদের প্রতিনিধিত্ব

এবারের নির্বাচনে নারী ও সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্ব হ্রাস পেয়েছে। মাত্র ৭ জন নারী ও ৪ জন সংখ্যালঘু সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, যা অন্তর্ভুক্তিমূলক সংসদ গঠনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বামপন্থীরা এককভাবে কোনো আসন জিততে পারেনি, বরিশাল-৫ আসনে বাসদের মনীষা চক্রবর্তী ২২ হাজার ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোর নারীবিদ্বেষী প্রচার ও ডানপন্থী জোয়ার এ ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে।

দক্ষিণপন্থী রাজনীতির উত্থান ও ভবিষ্যত চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশে দক্ষিণপন্থী রাজনীতির উত্থানের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধ, ভারতের বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি এবং আওয়ামী লীগের দমনমূলক শাসনের প্রতিক্রিয়া প্রধান ভূমিকা রেখেছে। একটি পরিচ্ছন্ন ভোট গণতন্ত্রকে আপাতত বাঁচালেও রাজনৈতিক ও সামাজিক মেরুকরণের এই সন্ধিক্ষণে মূল চ্যালেঞ্জ এখন才开始। জামায়াতের উত্থান ভবিষ্যত রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।