সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে নির্বাচনী দিনে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় আজ বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ চলছে একেবারেই ভিন্ন পরিবেশে। সরকারি পাহাড় কেটে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা এই বসতিতে সাধারণ সময়ে বাইরের কেউ প্রবেশ করলেই জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়। এমনকি জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও এখানে হামলার শিকার হতে হয়েছে। তবে আজকের নির্বাচনী দিনে সেই চিত্র সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে।
নারী ভোটারদের দীর্ঘ লাইন ও উৎসুক জনতা
বেলা ১১টার দিকে জঙ্গল সলিমপুরের এসএম পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্র পরিদর্শন করা হয়। কেন্দ্রের বাইরে উৎসুক জনতার ভিড় জমে আছে। ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লা, হাতপাখাসহ বিভিন্ন প্রার্থীর সমর্থকেরা বাইরে ঘোরাঘুরি করছেন। ভেতরে ঢুকে নারী-পুরুষের পৃথক সারি চোখে পড়ে। নারীদের সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা আনোয়ারা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, 'সকাল আটটায় এসেছি ভোট দিতে। মানুষের ভিড়ের কারণে দুই ঘণ্টায়ও ভোট দিতে পারিনি।'
ভোট দিয়ে বের হয়ে আসছিলেন এলাকার বাসিন্দা রোকিয়া বেগম। তিনি জানান, 'ভোট দিতে আসার আগে কিছুটা আতঙ্ক কাজ করেছে। তবে ভোটকেন্দ্রে আসার পর মনে হয়েছে সবকিছুই স্বাভাবিক।' জঙ্গল সলিমপুরে সরকারি পাহাড় কেটে প্লট বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে প্রায়ই হানাহানি ও সংঘর্ষ লেগে থাকে। সম্প্রতি দুটি সন্ত্রাসী দলের মধ্যে একাধিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। আনোয়ারা বেগম ও রোকিয়া বেগম দুজনেরই প্রত্যাশা, ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধি এলাকায় শান্তি ফেরাতে উদ্যোগ নেবেন।
ভোটারদের আশা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা
বৃদ্ধ রফিকুল ইসলাম ভোটকেন্দ্রে কথা বলেন। তিনি বলেন, 'শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দিছি। কোনো সমস্যা হয়নি। আমরা চাই, আমাদের যাতে উচ্ছেদ করা না হয়। উচ্ছেদ করলে বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে।' এসএম পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের প্রিসাইডিং অফিসার কাজী মোহাম্মদ সাঈদ জানান, এখানে মোট ভোটার রয়েছেন ৭ হাজার ১১৬ জন। বেলা ১১টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ হয়েছে ১ হাজার ১১৬টি।
তিনি আরও যোগ করেন, 'এই কেন্দ্রে দায়িত্ব পাওয়ার পর শুরুতে কিছুটা আতঙ্ক কাজ করেছিল। তবে গতকাল রাত থেকে এখন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল ও সর্বোচ্চ নিরাপত্তা রয়েছে। সুষ্ঠুভাবেই ভোট গ্রহণ হচ্ছে। ভোট শেষ হওয়া পর্যন্ত আশা করি পরিস্থিতি শান্ত থাকবে।' সীতাকুণ্ড থানার এসআই ইদ্রিস আলী নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি বলেন, 'দীর্ঘদিন পর এখানকার লোকজন ভোট দিতে পারছেন। তাঁরা খুশি। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। নিরাপদে ভোট দিতে আসতে পারছেন ভোটাররা।'
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও অতীতের ঘটনা
ভোটকেন্দ্রের বাইরে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর ভাই আজম চৌধুরীর সঙ্গে কথা হয়। তিনি দাবি করেন, 'এক সপ্তাহ ধরে জঙ্গল সলিমপুরে কোনো সন্ত্রাসী বাহিনী নেই। লোকজন নিরাপদে ভোট দিচ্ছে।' গত ১৯ জানুয়ারি জঙ্গল সলিমপুরে র্যাব সদস্যদের ওপর হামলা চালানো হয়। এতে র্যাবের পাঁচ সদস্য আহত হন এবং র্যাব কর্মকর্তা মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন। এই ঘটনায় ইয়াসিন বাহিনীর প্রধান ইয়াসিনসহ ২৫০ জনকে আসামি করা হয়।
৯০-এর দশক থেকে সরকারি খাস জমি দখল করে সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে অবৈধ বসতি গড়ে তোলা হচ্ছে। বর্তমানে রোকন উদ্দিন ও ইয়াসিনের অনুসারীরা এই অবৈধ বসতির নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন। র্যাব কর্মকর্তা নিহত হওয়ার পর জঙ্গল সলিমপুরে সমন্বিত অভিযানের কথা বলা হলেও এখনো তা শুরু হয়নি। র্যাব-৭ চট্টগ্রামের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান গতকাল বলেন, 'জঙ্গল সলিমপুরে কেউ ঝামেলা করতে চাইলে শায়েস্তা করা হবে। সেখানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।'
এলাকার বাসিন্দারা আশা প্রকাশ করেন যে, নির্বাচিত প্রতিনিধি এলাকার শান্তি ও উন্নয়নে কাজ করবেন। ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া শান্তিপূর্ণভাবে চলছে বলে জানা গেছে।
