ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন: গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধারে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ
বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা দীর্ঘ দেড় দশকের রুদ্ধশ্বাস সময়ের পর একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এই নির্বাচনটি দুটি প্রধান কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, এটি ১৫ বছর ধরে স্থবির হয়ে পড়া নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে পুনরায় সচল করার একটি প্রচেষ্টা। দ্বিতীয়ত, এটি একটি টেকসই রাজনৈতিক বন্দোবস্ত নিশ্চিত করার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে স্থায়ী রূপ দেওয়ার সংগ্রামের অংশ।
নির্বাচনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ভোটাধিকার একটি মৌলিক অধিকার হলেও এটি প্রায়শই দুর্লভ বস্তুতে পরিণত হয়েছে। শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের স্বীকৃত পথের অভাবে, ক্ষমতায় যারা আসেন তারা প্রায়ই আইনকানুনের মারফত নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে চেষ্টা করেন। এর ফলে ক্ষমতা পরিবর্তন প্রক্রিয়ায় প্রায়ই টানাহেঁচড়া বা রাজপথে রক্তপাতের ঘটনা ঘটে। এই প্রেক্ষাপটে, এবারের নির্বাচন কেবল একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়, বরং গণতন্ত্রের 'ন্যূনতম' প্রবেশপথ পুনরুদ্ধারের একটি সংগ্রাম।
নির্বাচনবিরোধী বয়ান ও বাস্তবতা
নাগরিক সমাজে প্রায়ই 'প্রকৃত গণতন্ত্র' খোঁজার নামে 'নির্বাচনবিরোধী' বয়ান শোনা যায়। এক পক্ষ মনে করে, নির্বাচন দিয়ে জনগণের মুক্তি সম্ভব নয় এবং সংসদকে 'শুয়োরের খামার' হিসেবে বিবেচনা করে। অন্যপক্ষের মতে, শুধু নির্বাচন দিয়ে গণতন্ত্র টেকসই হয় না, এর জন্য শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন। তবে, বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে নির্বাচনই প্রায়শই গায়েব হয়ে যায়, সেখানে এই বক্তব্যগুলো স্বৈরতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে ব্যবহৃত হতে পারে। গত ১৫ বছরে শেখ হাসিনার সরকারের আমলে ভোট কারচুপির অভিযোগের পর এই ধরনের যুক্তির ব্যবহার লক্ষণীয় ছিল।
ইতিহাসবিদ হাওয়ার্ড জিনের দৃষ্টিভঙ্গি
ইতিহাসবিদ হাওয়ার্ড জিন একবার বলেছিলেন, তিনি ভোট দিলেও বুথ থেকে বের হওয়ার পর তাঁর আসল কাজ শুরু হয় মানুষকে সংগঠিত করার। তাঁর মতে, শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলন থাকলে পদের দায়িত্বে কে রয়েছেন সেটি অগুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়। এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, নির্বাচন কেবল একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ, এরপর ক্রমাগত সক্রিয়তা জারি রাখা প্রয়োজন।
নির্বাচনোত্তর চ্যালেঞ্জসমূহ
নির্বাচনের পর বাংলাদেশের সামনে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ হাজির হবে। প্রথমত, 'জুলাই সনদ' বাস্তবায়ন ও ১৮০ দিনের অগ্নিপরীক্ষা। এই সনদের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এখনো ঐকমত্য হয়নি। নির্বাচিত সরকার একটি পক্ষ হিসেবে কাজ করবে, যা সমঝোতার পথকে কণ্টকাকীর্ণ করতে পারে। দ্বিতীয়ত, নাগরিক সমাজের জন্য নতুন রাজনৈতিক সমাজ বিনির্মাণ ও রাজনৈতিক ভাষা নির্মাণের চ্যালেঞ্জ। গত রেজিমে জন্ম নেওয়া নতুন জাগ্রত অংশ বিভিন্ন দলে ভিড়েছেন, ফলে শূন্যাবস্থা কাটাতে নতুন করে লড়াই শুরু করতে হবে।
গণতান্ত্রিক রূপান্তরের যাত্রা
এই নির্বাচন গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার শুরু মাত্র। পাঁচ বছর পরপর শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতার পালাবদল নিশ্চিত করার লড়াইয়ে আমরা প্রবেশ করছি। সংস্কারের জিকির বাস্তবায়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সক্রিয়তা প্রয়োজন। হাওয়ার্ড জিনের মতো, আমাদেরও নির্বাচনোত্তর সময়ে ক্রমাগত সক্রিয়তা জারি রাখতে হবে। গণতান্ত্রিক রূপান্তরের যাত্রায় নির্বাচন কেবল একটি প্রবেশদ্বার, এরপর সক্রিয়তার মাধ্যমেই এটিকে মসৃণ করতে হবে।
সহুল আহমদ, একজন লেখক ও গবেষক, এই মতামত প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, আজকের নির্বাচনের পর আমাদের লড়াই শুরু হবে, যা গণতন্ত্রকে টেকসই করতে সহায়ক হবে।
