ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শুরু: ভোটকেন্দ্রে উৎসবমুখর পরিবেশ, বিএনপি-জামায়াতের তীব্র লড়াই
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন শুরু, ভোটকেন্দ্রে উৎসবমুখর পরিবেশ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের মাধ্যমে বাংলাদেশে ভোট উৎসব শুরু হয়েছে। ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই সারা দেশের ভোটকেন্দ্রে নারী-পুরুষসহ নানা বয়সি ভোটারদের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে, সকাল সাড়ে ৭টায় ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও ভোটাররা বেশ আগেই কেন্দ্রে এসে অবস্থান নিয়েছেন। অনেককে ভোর থেকেই লাইনে দাঁড়াতে দেখা গেছে, যা নির্বাচনী পরিবেশের উদ্দীপনাকে প্রতিফলিত করছে।

বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে তীব্র লড়াই

এবারের নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে তীব্র লড়াইয়ের সম্ভাবনা দেখছেন অনেক পর্যবেক্ষক। তারা বলছেন, শ্বাসরুদ্ধকর এ ভোটের লড়াইয়ে নির্ধারিত হবে আগামীর বাংলাদেশে নেতৃত্ব কারা দেবেন। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের জুলাই সনদের ভবিষ্যৎও এই লড়াইয়ে চূড়ান্ত হবে। দেশের ২৯৯টি আসনে সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত টানা ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ভোটাররা দুটি ব্যালট পেপারে ভোট দিচ্ছেন—একটি সাদা ব্যালট সংসদ-সদস্য নির্বাচনের জন্য এবং গোলাপি ব্যালট গণভোটের জন্য।

নির্বাচনী প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা

ভোটগ্রহণ শেষে কেন্দ্রে কেন্দ্রে ভোটের প্রথম বেসরকারি ফলাফল প্রকাশ করবেন প্রিসাইডিং কর্মকর্তারা। তারপর রিটার্নিং কর্মকর্তা ও পরে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ফলাফল ঘোষণা করবে। শুক্রবার সকালের মধ্যে চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণার আশা করছে ইসি। নির্বাচনী নিরাপত্তায় সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৯ লাখ ১৯ হাজার সদস্য মাঠে রয়েছে। এছাড়া, ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ২১ হাজার ৫০৬টি ঝুঁকিপূর্ণ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি ও ভোটার অংশগ্রহণ

আওয়ামী লীগের আমলে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে পরপর তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের পর এবার একটি প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে। তবে, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। নিবন্ধিত ৬০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫০টি দল নির্বাচনে অংশ নিয়েছে, এবং মোট ২,০২৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যার মধ্যে ২৭৩ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন। নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতির কারণে ভোট পড়ার হার কিছুটা কম হতে পারে, কিন্তু সামগ্রিকভাবে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

ভোটার সংখ্যা ও বিদেশি পর্যবেক্ষক

এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন, যার মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন, নারী ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১,২৩২ জন। নির্বাচন পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশে সাড়ে পাঁচশ বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক এসেছেন, যাদের মধ্যে ভুটান, নাইজেরিয়া, মালয়েশিয়ার প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা রয়েছেন।

সিইসির ভাষণ ও আহ্বান

নির্বাচন ও গণভোটের আগের দিন বুধবার সন্ধ্যায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। তিনি ভোটারদের নির্ভয়ে কেন্দ্রে আসার আহ্বান জানান এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বার্থে নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেওয়ার অনুরোধ করেন। সিইসি বলেন, "ভোটদান আমাদের শুধু নাগরিক অধিকারই নয়, বরং এটি একটি বড় দায়িত্ব।" তিনি নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা এবং সাংবাদিকদের সহযোগিতারও আহ্বান জানান।

একটি হোটেলে বিদেশি সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের ব্রিফিংয়ে সিইসি বলেন, "অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের লক্ষ্যে আমরা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ও আইনকানুনের মধ্যেই কাজ করছি, তাই ভয়ের কোনো কারণ নেই।" তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ভোটগ্রহণ ও গণনার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়েছে এবং সব ভোটারকে অবাধে অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হচ্ছে।

সামগ্রিকভাবে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি উৎসবমুখর ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।