ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন: ভোটের আগের দিন উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতি
সারা দেশে আজ বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। তবে ভোটের আগের দিন বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) দেশের বিভিন্ন স্থানে বিপুল পরিমাণ টাকা উদ্ধার, ককটেল বিস্ফোরণ, প্রিসাইডিং অফিসারকে লাঞ্ছিত করা এবং ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনায় রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। এসব ঘটনায় ভোটারদের মধ্যে শঙ্কা থাকলেও মাঠ দখলে রেখেছে প্রায় ৯ লাখ নিরাপত্তা সদস্য।
টাকা উদ্ধারের হিড়িক ও বিভিন্ন ঘটনা
ভোটের আগের দিন সবচেয়ে বড় অংকের টাকা উদ্ধার হয়েছে নীলফামারীর সৈয়দপুর বিমানবন্দরে। ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতের আমিরের লাগেজ থেকে ৭৪ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়। এছাড়া পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় স্বেচ্ছাসেবক দল নেতার কাছ থেকে ৫০ লাখ, লক্ষ্মীপুরে বিএনপি প্রার্থী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানির গাড়ি থেকে ১৫ লাখ, চন্দনাইশে স্বতন্ত্র প্রার্থীর মাইক্রোবাস থেকে ১০ লাখ ৪৯ হাজার এবং শরীয়তপুরে জামায়াতের কার্যালয় থেকে ৭ লাখ ২০ হাজার টাকা উদ্ধার করেছে যৌথ বাহিনী। কুমিল্লার মুরাদনগরে ২ লাখ টাকাসহ স্থানীয় জনতার হাতে আটক হন ধামঘর ইউনিয়ন জামায়াতের আমির হাবিবুর রহমান হেলালী।
হাতেনাতে আটক ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের সাজা
রাজধানীর সূত্রাপুরে টাকা বিতরণের সময় থানা জামায়াতের নায়েবে আমির মো. হাবিবকে আটকের পর ভ্রাম্যমাণ আদালত দুই দিনের কারাদণ্ড দিয়েছেন। মিরপুর শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে প্রভাব বিস্তারের দায়ে জামায়াতের দুই পোলিং এজেন্টকে দুই বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ওয়ারী ও মুগদা এলাকায় সন্দেহজনক চলাফেরা ও বিশৃঙ্খলার দায়ে বেশ কয়েকজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। নেত্রকোণায়ও টাকা বিতরণের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে এক ইউনিয়ন জামায়াতে আমিরকে আটকের খবর পাওয়া গিয়েছে।
বিএনপি-জামায়াত ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জড়িততা
কেবল বিএনপি-জামায়াতই নয়, স্বতন্ত্র প্রার্থীদেরও কেউ কেউ টাকাসহ হাতেনাতে ধরা পড়েছেন। চট্টগ্রামের চন্দনাইশে বিজিবি এবং সেনাবাহিনীর যৌথ তল্লাশির সময়ে একটি মাইক্রোবাস থেকে ১০ লাখ ৪৯ হাজার টাকাসহ তিনজনকে আটক করা হয়। তাদের দাবি, ওই অর্থ নির্দলীয় প্রার্থী মো. মিজানুল হকের এজেন্টদের খরচের জন্য। এদিকে জামালপুর-৩ আসনের নির্দল প্রার্থী সাদিকুর রহমান শুভর পক্ষে ৯৪ হাজার ৫০০ টাকা বিতরণের সময়ে তিনজনকে আটক করা হয়েছে। তাদের প্রত্যেককে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।
ভোটকেন্দ্রে হট্টগোল ও কর্মকর্তা লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনা
ঢাকা-৬ আসনে জুবলি স্কুল কেন্দ্রে বিএনপি ও জামায়াত কর্মীদের মধ্যে হাতাহাতির একপর্যায়ে প্রিসাইডিং অফিসার শফিকুল হককে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয়। ধানমন্ডি-১০ আসনে আইএসটি ভোটকেন্দ্রে কক্ষ খুলে না দিয়ে দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ায় প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ও দুই দারোয়ানকে আটক করেছে পুলিশ। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে প্রিসাইডিং অফিসার বশির উল্লাহকে ভুলবশত জামায়াত নেতা সন্দেহে দীর্ঘক্ষণ আটকে রাখে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা। পরে সেনাবাহিনী গিয়ে তাকে উদ্ধার করে।
বিস্ফোরণ ও জালিয়াতির অভিযোগ
ভোটের আগের রাতে গোপালগঞ্জ-৩ আসনের আটটি ভোটকেন্দ্রের আশেপাশে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এতে কেউ হতাহত না হলেও জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। এ ঘটনায় যৌথ বাহিনী একজনকে আটক করেছে। ঝিনাইদহ-৪ আসনের একটি কেন্দ্র থেকে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার পোলিং এজেন্টদের আগেভাগেই স্বাক্ষর করা ২৩টি শিট উদ্ধার করেছে প্রশাসন। এছাড়া সিলেট নগরের শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে পর্যবেক্ষক পরিচয়ে প্রবেশের সময় তিন তরুণকে আটক করে পুলিশে দিয়েছে এলাকাবাসী।
নির্বাচন কমিশনের অবস্থান ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা
মাঠের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী ও বিজিবি টহল জোরদার করেছে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, যেকোনও মূল্যে ভোটকেন্দ্রের শৃঙ্খলা বজায় রাখা হবে। ভোটারদের নিরাপত্তায় আকাশপথে ড্রোনের মাধ্যমেও নজরদারি চালানো হচ্ছে। নির্বাচনী প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যাপক প্রস্তুতি ও তৎপরতা চলছে।
