ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট: ছুটি, যান চলাচল ও এমএফএস বিধিনিষেধ জেনে নিন
নির্বাচন: ছুটি, যান চলাচল ও এমএফএস বিধিনিষেধ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট: সরকার ও নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে ঘিরে সরকার এবং নির্বাচন কমিশন (ইসি) একগুচ্ছ নির্দেশনা জারি করেছে। বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচনের সময় কোথায় কী খোলা থাকবে, কী বন্ধ থাকবে, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসে কী ধরনের কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে, রাস্তায় কোন যান চলাচল করতে পারবে এবং ভোট দিতে গেলে কী তথ্য জানা জরুরি— সে সব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখানে তুলে ধরা হলো।

সরকারি ছুটির নির্দেশনা

নির্বাচন উপলক্ষে ভোটের আগের দিন বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) এবং ভোটের দিন বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। ভোটের পরের দুদিন শুক্রবার ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি হিসেবে গণ্য হবে। ফলে এই সময়ে সরকারি অফিস-আদালত, অধিকাংশ বেসরকারি অফিস ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকবে।

তবে জরুরি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো খোলা থাকবে: হাসপাতাল, ক্লিনিক, ওষুধের দোকান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং জরুরি প্রশাসনিক বিভিন্ন দপ্তর স্বাভাবিকভাবে কার্যক্রম চালিয়ে যাবে।

পরিবহণ চলাচলে বিধিনিষেধ

নির্বাচন কমিশন পরিবহণ চলাচলের ওপর নানা বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।

  • মোটরসাইকেল: মঙ্গলবার রাত ১২টা থেকে শুক্রবার রাত ১২টা পর্যন্ত মোট ৭২ ঘণ্টা মোটরসাইকেল চলাচলে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে।
  • অন্যান্য যানবাহন: ১১ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা পর্যন্ত ট্যাক্সি ক্যাব, মাইক্রোবাস, পিকআপ ও ট্রাক চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকবে।

নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবে যেসব যানবাহন:

  1. জরুরি সেবায় নিয়োজিত যানবাহন এবং ওষুধ, স্বাস্থ্য-চিকিৎসাসামগ্রী ও সংবাদপত্র বহনকারী যানবাহন।
  2. রাজধানীতে মেট্রোরেল স্বাভাবিক সময়সূচি অনুযায়ী চালু থাকবে, তবে নিরাপত্তার কারণে কোনো কোনো স্টেশনের গেট সাময়িক বন্ধ থাকতে পারে।
  3. আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী, প্রশাসন, সাংবাদিক, অনুমতিপ্রাপ্ত পর্যবেক্ষক এবং ইসির স্টিকারযুক্ত যানবাহন।
  4. নির্বাচন কমিশনের অনুমোদন সাপেক্ষে নির্বাচনি কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারী বা অন্য ব্যক্তিদের মোটরসাইকেল।
  5. টেলিযোগাযোগকে জরুরি সেবা হিসেবে বিবেচনায় বিটিআরসি ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের যানবাহন।
  6. বিমানযাত্রার টিকিট বা সমপর্যায়ের প্রমাণ দেখাতে পারলে বিমানবন্দরে যাতায়াতকারী যাত্রী ও তাদের স্বজনদের ব্যবহৃত যানবাহন।
  7. জাতীয় মহাসড়ক, বন্দর এবং আন্তঃজেলা বা মহানগর থেকে বের হওয়া বা প্রবেশের প্রধান সড়কগুলোতে দূরপাল্লার যাত্রীবাহী বাস ও যানবাহন স্থানীয় পর্যায়ে যাতায়াতের ক্ষেত্রে ছাড় থাকবে।
  8. রিটার্নিং কর্মকর্তার অনুমোদন ও স্টিকার প্রদর্শন সাপেক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী এবং তাদের নির্বাচনি এজেন্টরা একটি ছোট গাড়ি (জিপ, কার বা মাইক্রোবাস) নিয়ে চলাচল করতে পারবেন।

মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসে বিধিনিষেধ

নির্বাচনের সময় ভোট কেনাবেচা বা নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে অর্থের জোগান বন্ধ করতে বাংলাদেশ ব্যাংক কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। ৯ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত ১২টা থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি রাত ১১টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) যেমন বিকাশ, নগদ, রকেটসহ অন্যান্য সেবায় বিশেষ বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

  • ক্যাশ-ইন ও ক্যাশ-আউট বন্ধ: টানা ৯৬ ঘণ্টা বা চারদিনে গ্রাহকেরা কিছু সীমিত সেবা ব্যবহার করতে পারলেও ক্যাশ-ইন ও ক্যাশ-আউটের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। ফলে এই সময়ে কোনো এজেন্ট পয়েন্ট থেকে গ্রাহকেরা তাদের হিসাবে টাকা জমা দিতে বা নগদ টাকা উত্তোলন করতে পারবেন না।
  • ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান: দেশের সব তফসিলি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বুধ ও বৃহস্পতিবার (১১ ও ১২ ফেব্রুয়ারি) বন্ধ থাকবে। তবে ইন্টারনেট ব্যাংকিং, এমএফএস এবং পয়েন্ট অব সেলস (পিওএস) সার্ভিসগুলো চালু থাকবে।
  • ‘সেন্ড মানি’ সেবার সর্বোচ্চ সীমা: একজন গ্রাহক প্রতি লেনদেনে সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকা পাঠাতে পারবেন এবং দিনে সর্বোচ্চ ১০ বার লেনদেন করা যাবে। অর্থাৎ দিনে মোট ১০ হাজার টাকার বেশি পাঠানো সম্ভব হবে না।
  • মোবাইল রিচার্জ ও পেমেন্ট স্বাভাবিক: মোবাইল রিচার্জ, ইউটিলিটি বিল (বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি) পরিশোধ এবং কেনাকাটার পেমেন্ট আগের মতোই চালু রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে নতুন কোনো নির্দিষ্ট সীমা আরোপ করা হয়নি।
  • শিক্ষা ও জরুরি ফি পরিশোধ: শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ফি এবং অন্যান্য সরকারি জরুরি সেবার ফি প্রচলিত নিয়মেই পরিশোধ করা যাবে।

ভোট দিতে প্রয়োজনীয় তথ্য

ভোটের দিন কেন্দ্রে গিয়ে ঝামেলা এড়াতে এবং দ্রুত ভোট প্রদান নিশ্চিত করতে ভোটারদের দুটি তথ্য আগে থেকে জেনে রাখা জরুরি: আপনার ভোটকেন্দ্র কোনটি এবং ভোটার তালিকায় আপনার ভোটার নম্বর কত।

তথ্য জানার পদ্ধতি:

  1. নির্বাচন কমিশনের ‘স্মার্ট ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট বিডি’ অ্যাপ ব্যবহার করে এনআইডি নম্বর ও জন্ম তারিখ দিলে ভোটার তার ক্রমিক নম্বর ও কেন্দ্রের তথ্য পাবেন।
  2. ১০৫ হটলাইন নম্বরে কল করে অপারেটরের সঙ্গে কথা বলে ৯ চাপলে ভোটার নম্বর ও ভোটকেন্দ্রের তথ্য জানা যাবে।
  3. এসএমএসের মাধ্যমে ‘পিসি এনআইডি’ (PC NID) লিখে ১০৫ নম্বরে পাঠালে ফিরতি এসএমএসে তথ্য পাওয়া যাবে।
  4. নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট, উপজেলা বা জেলা নির্বাচন অফিস থেকেও এই তথ্য সংগ্রহ করা যাবে।

ভোট প্রদানের প্রক্রিয়া

নির্বাচনের দিন যেসব বাংলাদেশি নাগরিকের বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি এবং নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় যাদের নাম রয়েছে, কেবল তারাই ভোট দিতে পারবেন। ভোটার তালিকায় নাম থাকার বিষয়টি জাতীয় পরিচয়পত্রে (এনআইডি) উল্লেখ থাকা জন্ম তারিখের ওপর নির্ভর করে।

নির্ধারিত কেন্দ্রে সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলবে। ভোট দিতে যাওয়ার সময় এনআইডি কার্ড নিয়ে যাওয়া ভালো, তবে বাধ্যতামূলক নয়। কেন্দ্রে প্রিসাইডিং অফিসার ও পোলিং এজেন্টরা ছবিযুক্ত তালিকা দেখে ভোটারের পরিচয় যাচাই করবেন। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর ভোটারের আঙ্গুলে অমোচনীয় কালি লাগিয়ে দেওয়া হবে। এরপর ভোটারকে দুটি ব্যালট পেপার দেওয়া হবে— সংসদ নির্বাচনের জন্য একটি সাদা-কালো ব্যালট এবং গণভোটের জন্য আলাদা রঙিন ব্যালট। গোপন কক্ষে গিয়ে ভোটার পছন্দের প্রতীকে সিল মারবেন এবং ব্যালট পেপারটি লম্বালম্বি ভাঁজ করে নির্ধারিত বাক্সে ফেলবেন।