ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কক্সবাজারের পর্যটন খাতে ব্যাপক স্থবিরতা
মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কক্সবাজারের পর্যটন খাতে একপ্রকার স্থবিরতা নিয়ে এসেছে। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) থেকে নির্বাচনের পরদিন পর্যন্ত যানবাহন চলাচলে কঠোর বিধিনিষেধ এবং নির্বাচনী এলাকায় অবস্থান সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে গণপরিবহনসহ স্থানীয়ভাবে সিএনজি ও অটোরিকশা চলাচল সীমিত করা হয়েছে। পাশাপাশি শহরের বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট বসিয়ে নিরাপত্তা তল্লাশি কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে, যা পর্যটকদের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছে।
হোটেল-মোটেলের কর্মী ছুটিতে, বুকিংয়ে ধস
অন্যদিকে, ভোট দিতে নিজ নিজ এলাকায় ছুটিতে যাচ্ছেন হোটেল-মোটেলের অনেক কর্মী, ফলে ১০ থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কক্সবাজারের পর্যটন কার্যক্রমে ব্যাপক স্থবিরতা দেখা দেবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কক্সবাজারের পাঁচ শতাধিক হোটেল-মোটেলে ১০ শতাংশেরও কম কক্ষ বুকিং রয়েছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পর্যটকদের ভোটের আগে কক্সবাজারে না আসার পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের প্রতিক্রিয়া ও পরিস্থিতি বিশ্লেষণ
মেরিন ড্রাইভ হোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, "অনেক বছর পর দেশে স্বতঃস্ফূর্ত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বিভিন্ন পেশার মানুষ ভোট দিতে নিজ নিজ এলাকায় যাচ্ছেন, এর মধ্যে হোটেলকর্মীরাও রয়েছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে যানবাহন চলাচলে বিধিনিষেধের কথা জানানো হয়েছে। কক্সবাজারে এসে ঘোরাফেরা করতে না পারলে বেড়াতে আসার উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়।"
কক্সবাজার হোটেল-গেস্ট হাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার যোগ করেন, "মঙ্গলবার রাত থেকে শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ট্যাক্সিক্যাব, কার, মাইক্রোবাস, পিকআপ ও ট্রাক চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। স্থানীয়ভাবে সিএনজি ও অটোরিকশা চলাচলও সীমিত করা হচ্ছে। শহরের বিভিন্ন মোড়ে তল্লাশি চালানো হবে বলে জেলা প্রশাসন জানিয়েছে। ভোগান্তি এড়াতে আমরা তিন দিন বুকিং নিরুৎসাহিত করছি।"
পর্যটন খাতের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
কক্সবাজার ট্যুরিস্ট ক্লাব ও ট্যুর অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন (টুয়াক)-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মো. রেজাউল করিম জানান, তারকা হোটেলগুলোতে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কক্ষ বুকিং রয়েছে, যার বেশিরভাগই বিদেশি নাগরিক। সাধারণ হোটেলগুলোতে বুকিং প্রায় নেই বললেই চলে। ওশান প্যারাডাইস লিমিটেডের বিপণন ব্যবস্থাপক ইমতিয়াজ নুর সোমেল বলেন, "আগামী তিন দিনে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কক্ষ বুকিং রয়েছে। এর অর্ধেক বিদেশি এনজিও কর্মী, যারা কর্মসূত্রে কক্সবাজারে অবস্থান করছেন। নির্বাচনকালীন ভোগান্তির কথা জানার পর অনেকেই ভ্রমণসূচি পরিবর্তন করছেন।"
কক্স টুডে হোটেলের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) আবু তালেব শাহ বলেন, দুই শতাধিক কক্ষের মধ্যে বুকিং রয়েছে মাত্র ২০ থেকে ২৫টি। সৈকতের বেলাভূমিতে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থেকে আসা পর্যটক আবিদুর রহমান বলেন, "নির্বাচনের পরদিন ফেরার পরিকল্পনা ছিল। তবে যান চলাচল সীমিত ও তল্লাশির বিষয়টি জানার পর রাতেই ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।"
প্রশাসনের ভূমিকা ও নির্বাচনী প্রস্তুতি
সায়মান হোটেলের ফোকাল পয়েন্ট আসাদুজ্জামান নূর জানান, ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দুই শতাধিক কক্ষের মধ্যে প্রায় ৫০টি বুকিং রয়েছে, যার বেশিরভাগ বিদেশি অতিথি। কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান বলেন, "সবার ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। ভোটের সময় নিজ এলাকায় অবস্থান করাই উত্তম।"
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা এম এ মান্নান বলেন, "নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে প্রশাসন নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করছে। শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।" এই অবস্থায়, পর্যটন খাতের স্থবিরতা নির্বাচন পরবর্তী সময়ে স্বাভাবিক হওয়ার আশা করা হচ্ছে, তবে বর্তমানে এটি স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে।
