মানিকগঞ্জ-৩ আসনে নির্বাচনী মাঠে বিএনপির আফরোজা খানম রিতার দৃঢ় অবস্থান
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মানিকগঞ্জ-৩ (সদর ও সাটুরিয়া) আসনে ভোটের মাঠে শেষ মুহূর্তে স্পষ্ট হয়ে উঠছে একমুখী সমীকরণ। এখানে ভোটারের একটি বড় অংশ নারী, এবং প্রার্থীও একজন নারী হিসেবে দাঁড়িয়েছেন। পাশাপাশি, সংখ্যালঘু সনাতনী হিন্দু ভোটারদের ব্যাপক অংশ ধানের শীষ প্রতীকের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় নির্বাচনী গণনায় বিএনপি এগিয়ে রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিচ্ছেন।
পিতার আসন পুনরুদ্ধারে কন্যার লড়াই
এ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হলেন দলটির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আফরোজা খানম রিতা। তিনি সাবেক মন্ত্রী ও একাধিকবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য হারুনুর রশিদ খান মুন্নুর কন্যা। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মানিকগঞ্জ-৩ আসন থেকে মুন্নু বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। একই সময়ে তিনি মানিকগঞ্জ-২ আসন থেকেও রেকর্ড ভোটে জয়লাভ করেন। সেই ঐতিহাসিক আসন পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে এবার মাঠে নেমেছেন তার কন্যা আফরোজা খানম রিতা।
ভোটার পরিসংখ্যান ও নারী সমর্থন
নির্বাচনি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ১২৪ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার রয়েছেন ২ লাখ ৬৬৫ জন এবং পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৯৯ হাজার ৪৫৮ জন। এছাড়া একজন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটারও রয়েছেন। নারী প্রার্থী হওয়ায় নারী ভোটারদের একটি বড় অংশ তার দিকেই ঝুঁকবে বলে প্রত্যাশা করছেন রিতা নিজেই।
দলীয় ভোট ব্যাংক ও সংখ্যালঘু ভোটের সম্ভাবনা
বিএনপির দলীয় সূত্রমতে, এ আসনে দলটির নিজস্ব ভোট ব্যাংক প্রায় ১ লাখ ৫৫ হাজার। এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে সনাতনী হিন্দু সম্প্রদায়ের ৬৫ থেকে ৭০ হাজার ভোটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্যফ্রন্টের সভাপতি গৌরাঙ্গ সরকার এবং পূজা উদযাপন পরিষদের জেলা শাখার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বাসুদেব গোস্বামী জানিয়েছেন, তাদের সম্প্রদায়ের অন্তত ৯০ শতাংশ ভোট এবার ধানের শীষে পড়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।
সংগঠনিক ভিত ও নেতাকর্মীদের আস্থা
দীর্ঘ ১৬ বছর আওয়ামী লীগ সরকারের দমন-পীড়নের মধ্যেও মানিকগঞ্জে বিএনপির সাংগঠনিক ভিত ধরে রেখেছেন আফরোজা খানম রিতা। আন্দোলন-সংগ্রামে মাঠে থাকা নেতাকর্মীদের আইনি ও আর্থিক সহায়তা প্রদান, পরিবারগুলোর খোঁজখবর রাখা এবং কেন্দ্র ঘোষিত সব কর্মসূচি বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেওয়ার মাধ্যমে তিনি নেতাকর্মীদের গভীর আস্থা অর্জন করেছেন। জেলা কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সালাম বাদল উল্লেখ করেন, সংকটকালে যখন অনেকেই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, তখন রিতা আপা নেতাকর্মীদের পাশে বটবৃক্ষের মতো দাঁড়িয়েছেন। সেই দায়বদ্ধতা থেকেই এবার সবাই একাট্টা হয়ে কাজ করছে।
প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের অবস্থান
অন্যদিকে, জোটগত আসন বণ্টনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জামায়াতে ইসলামী মানিকগঞ্জ-৩ আসন ছেড়ে দিয়েছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে। ফলে রিকশা প্রতীকে ১০ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মুহাম্মদ আবু সাইদ নুর। তবে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে তার তেমন পরিচিতি নেই বলে জানা গেছে। জামায়াত নেতাদের ভাষ্যমতে, এ আসনে জোট প্রার্থীর পক্ষে মাঠে দৃশ্যমান তৎপরতাও খুব সীমিত। এদিকে, দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করায় বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত আতাউর রহমান আতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সীমিত পরিসরে প্রচারণা চালালেও তার প্রভাব তেমন নেই বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মত প্রকাশ করেছেন।
মোট প্রার্থী ও শেষ মুহূর্তের পরিবর্তন
উল্লেখ্য, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মানিকগঞ্জ-৩ (মানিকগঞ্জ–সাটুরিয়া) আসনে মোট ৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের আফরোজা খানম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের রিকশা প্রতীকের মুহাম্মদ সাইদ নুর, স্বতন্ত্র প্রার্থী সূর্যমুখী ফুল প্রতীকের মফিজুল ইসলাম খান কামাল, জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকের আবুল বাশার বাদশা, জাতীয় পার্টি (জেপি) মনোনীত বাইসাইকেল প্রতীকের মোয়াজ্জেম হোসেন খান মজলিশ, ইসলামী আন্দোলনের হাতপাখা প্রতীকের সামসুদ্দিন, বাংলাদেশ জাসদের মোটরগাড়ি প্রতীকের মো. সাজাহান আলী, এবং স্বতন্ত্র ফুটবল প্রতীকের আতাউর রহমান আতা। শেষ মুহূর্তে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী আওয়ামী ঘরানার ড. রফিকুল ইসলাম রফিক।
সব মিলিয়ে, দলীয় ভোট ব্যাংক, নারী ভোটারদের ব্যাপক সমর্থন এবং সংখ্যালঘু ভোটের বড় অংশ ধানের শীষে যুক্ত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনার কারণে মানিকগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপি প্রার্থী আফরোজা খানম রিতার অবস্থান অত্যন্ত শক্ত বলে স্থানীয় রাজনৈতিক মহল মনে করছেন। এই নির্বাচনী লড়াইয়ে তার সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করছে ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও রাজনৈতিক গতিশীলতার উপর।
