নির্বাচন ও দেশ গঠনে বিভেদ নয়: রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি আহ্বান
নির্বাচন ও দেশ গঠনে বিভেদ নয়: নেতাদের প্রতি আহ্বান

নির্বাচন ও দেশ গঠনে বিভেদ নয়: রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি আহ্বান

১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন। এই নির্বাচনকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলো সরকার গঠনের লক্ষ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে মাঠে নেমেছে। তবে ভোটের ময়দানে কিছু শঙ্কাও বিদ্যমান রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যদি কোনো দল ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়, তাহলে জুলাই বিপ্লবের সফলতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।

নেতাদের আক্রমণাত্মক বক্তব্যের প্রভাব

ইতোমধ্যে বিভিন্ন জনসভায় নেতাদের শিষ্টাচারবহির্ভূত বক্তব্যে নির্বাচনী পরিবেশে অশুভ ইঙ্গিত দেখা দিয়েছে। বর্তমানে দেশের দুই বৃহৎ রাজনৈতিক দলের মধ্যে ব্যাপক দূরত্ব তৈরি হয়েছে। একটি দল অতিরিক্ত মাত্রায় আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার করছে, যা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে এবং দেশের ইতিহাসে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে।

বিভিন্ন দলের সম্মানিত নেতারা তাদের নির্বাচনি ইশতেহার দিয়ে জনগণকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু একে অপরের প্রতি ব্যক্তিগত আক্রমণ করে কিছু নেতা নিজেদের অবস্থানই দুর্বল করে ফেলেছেন। জনগণ শীর্ষ নেতৃত্বের কাছ থেকে এ ধরনের আচরণ প্রত্যাশা করে না। ব্যক্তি আক্রমণ ও ট্রল করার মাধ্যমে মানুষকে হেয় প্রতিপন্ন করা সুশীল সমাজকে বিব্রত করে তোলে।

শ্রদ্ধা ও মমত্ববোধের মাধ্যমে জনসমর্থন অর্জন

দীর্ঘদিন পর একটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় নেতাদের উচিত পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ও মমত্ববোধ প্রদর্শন করা। কাদা ছোড়াছুড়ি বা হেয়প্রতিপন্ন করার পরিবর্তে নিজেকে শ্রদ্ধার পাত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে জনগণের ভালোবাসা অর্জন করতে হবে। মিথ্যা প্রতিশ্রুতি বা ধর্মকে ব্যবহার না করে দলের আদর্শ ও মূল্যবোধ জনগণের কাছে তুলে ধরা উচিত।

নির্বাচনি ময়দানে এনসিপির কিছু নেতা একটি জনপ্রিয় দলের শীর্ষ নেতাকে নিয়ে অশ্লীল মন্তব্য করেছেন। তবে সেই নেতা কোনো জবাব দেননি, যা তার পারিবারিক শিক্ষার পরিচয় বহন করে। অশ্লীল ভাষা ব্যবহারকারীরা জনগণের কাছে ধিকৃত হয় এবং তাদের নিচু মানসিকতা প্রকাশ পায়।

ভুয়া বক্তব্যের পরিণতি

নির্বাচনী প্রচারে এক দল কর্তৃক অন্য দলকে বাক্যবাণে জর্জরিত করা সাধারণ ঘটনা। কিন্তু এমন কোনো বক্তব্য দেওয়া উচিত নয়, যা পরবর্তীতে লজ্জার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। উদাহরণস্বরূপ, জামায়াতের এক শীর্ষ নেতা বিএনপির শীর্ষ নেতার পারিবারিক ইস্যু নিয়ে ভুয়া মন্তব্য করেছেন, যা মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে। এ ধরনের বক্তব্য জনগণ গ্রহণ করেনি এবং সুধী মহলে সেই নেতার জনপ্রিয়তা হ্রাস পেয়েছে।

সকল দলের প্রতি পরামর্শ

সকল রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের উচিত নিজ নিজ অবস্থানে স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং একটি সুষ্ঠু খেলার মাঠ তৈরি করা। কোনো ধ্বংসাত্মক কাজে অংশগ্রহণ বা উৎসাহিত না করে জনগণকে ভোটকেন্দ্রে যেতে অনুপ্রাণিত করতে হবে। আনন্দঘন ও উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি করে ক্ষমতা বা অর্থের লোভ নয়, সেবার মানসিকতা নিয়ে রাজনীতি করতে হবে।

বিএনপি একটি জনপ্রিয় দল হিসেবে তার শীর্ষ নেতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা উপলব্ধি করেছেন। তিনি দেশের মাটিতে পা রেখে জাতির কাছ থেকে প্রাপ্ত শ্রদ্ধা ও ভালোবাসাও অনুধাবন করেছেন। জনগণ তার মধ্যে সেই নেতাদের ছায়া দেখতে চায়।

গঠনমূলক সমালোচনা ও ঐক্যের আহ্বান

জাতি এমন নেতা প্রত্যাশা করে, যিনি আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার না করে সুন্দর বক্তব্য দিয়ে মানুষের মন জয় করেন। নির্বাচনি বক্তব্যে জনগণকে আশা দেখানো, মানুষের মধ্যে মিশে যাওয়া এবং সর্বমহলে প্রশংসা অর্জন করা গুরুত্বপূর্ণ।

প্রোপাগান্ডা, অর্থ, নকল ব্যালট, ভয়ভীতি প্রদর্শন না করে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সৎ দক্ষ নেতা নির্বাচনের জন্য মুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে হবে। দেশ ও দেশের মানুষকে ভালোবেসে নিরপেক্ষ নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিতে হবে। গঠনমূলক সমালোচনা করে দেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার দিকে এগিয়ে যেতে হবে।

সরকারকে সাহায্য করে এবং সকল দলকে সম্মান দিয়ে দেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করতে হবে। জুলাই বিপ্লবের সফলতা কামনা করে নির্বাচনকালীন সকল ভেদাভেদ ভুলে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে জাতি যেমন এক কাতারে দাঁড়িয়েছিল, তেমনি নিরপেক্ষ নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিয়ে সরকার গঠনে এক কাতারে আসা জাতির প্রত্যাশা।

লেখক: গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আবদুর রাজ্জাক