মুঠোফোনের পেছনের দিক দেখে উদ্ঘাটন বিএনপি নেতা কামরুল হত্যার রহস্য
রাজধানীর বাড্ডায় প্রকাশ্য দিবালোকে সংঘটিত বিএনপি নেতা কামরুল আহসান সাধন হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে একটি মুঠোফোনের পেছনের অংশ। ঘটনাস্থলের সিসি ক্যামেরার ভিডিও থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন খুনি শনাক্ত করা যাচ্ছিল না। গুপ্তচর নিয়োগ করেও কোনো সফলতা আসেনি পুলিশের।
দিশাহীন তদন্তে দিশা মিলল মুঠোফোনে
২০২৫ সালের ২৫ মে রাত ১০টার দিকে মধ্য বাড্ডার গুদারাঘাটে একটি চায়ের দোকানে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলেন গুলশান থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক কামরুল আহসান সাধন। হঠাৎ আগ্নেয়াস্ত্রধারী দুই যুবক তাঁকে লক্ষ্য করে একের পর এক গুলি চালিয়ে হত্যা করে পালিয়ে যান। কামরুল হত্যার ঘটনায় তাঁর স্ত্রী দিলরুবা আক্তার বাদী হয়ে বাড্ডা থানায় মামলা করেন। থানা–পুলিশ হয়ে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পায় ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)।
কামরুল হত্যাকাণ্ডের পর পাশের সিসিটিভি ক্যামেরার ভিডিও সংগ্রহ করেছিল পুলিশ। কিন্তু তাতে খুনিদের চিহ্নিত করা যাচ্ছিল না। এরপর গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক দল তদন্তে নেমে আরও সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ শুরু করে। ঘটনাস্থল ও আশপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়।
মুঠোফোনের পেছনের দিকই হয়ে ওঠে মূল সূত্র
ডিবির এক কর্মকর্তা জানান, একটি ফুটেজে দুই শুটারের সঙ্গে আরও দুই ব্যক্তিকে দেখা যায়। তবে হত্যাকারী পর্যন্ত পৌঁছাতে সেই ফুটেজও যথেষ্ট মনে হচ্ছিল না। তখন এক কর্মকর্তার নজরে পড়ে চারজনের মধ্যে একজনের হাতে মুঠোফোন, তাতে ফোনের পেছনের দিক স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। সেটির সূত্র ধরেই ফোনের কোম্পানি ও মডেল সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, তারপর ওই সময়ের মধ্যে ঘটনাস্থল ও আশপাশ এলাকায় এই মডেলের মুঠোফোন কারা কারা ব্যবহার করেছে, তার একটি দীর্ঘ তালিকা সংগ্রহ করা হয়। সেই তালিকা ধরে তদন্তের এক পর্যায়ে সন্দেহভাজন একজনকে শনাক্ত করা হয়। সেই সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তারের পরই উদ্ঘাটিত হয় কামরুল আহসান সাধন হত্যার রহস্য।
গ্রেপ্তার ও স্বীকারোক্তির ধারাবাহিকতা
মুঠোফোনের সূত্রে গ্রেপ্তার ওই ব্যক্তির নাম মিজানুর রহমান মীম। তিনি ঢাকার মেট্রোরেল পরিচালনাকারী মাস ট্রানজিট কোম্পানিতে সেফটি অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ডিবি কর্মকর্তা মহিতুল ইসলাম জানান, হত্যার মিশন বাস্তবায়নের পর মিজানুর রহমান মুঠোফোনটি বাড্ডার একটি খালে ফেলে দিয়েছিলেন।
ঘটনার এক মাসের বেশি সময় পর (৮ জুলাই, ২০২৫) কিশোরগঞ্জের ভৈরব থেকে মিজানুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়। গ্রেপ্তারের পর তিনি ঘটনার দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তাঁকে গ্রেপ্তারের ৮ দিন পর (১২ জুলাই, ২০২৫) হৃদয় চৌধুরী নামের একজনকে ফরিদপুরের নগরকান্দা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর চার দিন পর (১৬ জুলাই, ২০২৫) নেত্রকোনার কলমাকান্দা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় সাহেদ হোসেন মুন্না নামের আরেকজনকে।
বিদেশ থেকে আসে খুনের নির্দেশ
তদন্ত–সংশ্লিষ্ট ডিবি সূত্র জানিয়েছে, বিএনপি নেতা কামরুল হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে রয়েছেন পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী মেহেদী হাসান। তিনি এখন যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন। বাড্ডা ও গুলশান এলাকার ইন্টারনেট ব্যবসা, কাঁচাবাজারে চাঁদাবাজি, এলাকার নিয়ন্ত্রণ এবং আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্বে মেহেদীর নির্দেশে কামরুলকে হত্যা করা হয়।
ডিবি কর্মকর্তা মহিতুল ইসলাম বলেন, খুন করার জন্য হৃদয় ও মুন্নাকে ভাড়া করা হয়েছিল। মিজানুর ও জাহিদ বাড্ডা এলাকারই বাসিন্দা। তাঁরা দুজনই মেহেদীর ঘনিষ্ঠ। জাহিদের মাধ্যমে হৃদয় ও মুন্নাকে ভাড়া করা হয়। হৃদয়ের নির্দিষ্ট কোনো পেশা নেই। মুন্না পেশায় গাড়িচালকের সহকারী। হত্যাকাণ্ডের পর হৃদয় ও মুন্নাকে ৩০ হাজার করে দেওয়া হয়।
বিরিয়ানি খেয়ে শুরু হয় খুনের মিশন
হৃদয় চৌধুরী এরই মধ্যে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। হৃদয় চৌধুরীর জবানবন্দি উদ্ধৃত করে তদন্ত–সংশ্লিষ্ট এক ডিবি কর্মকর্তা বলেন, খুন করতে যাওয়ার আগে তাঁরা চারজন গুলশান লিংক রোড গুদারাঘাটের কাছে নয়ন বিরিয়ানি হাউসে বিরিয়ানি খান। কামরুলকে হত্যার পর তাঁরা আবার গুদারাঘাটে মিলিত হন। তারপর জাহিদ আহমেদের সাঁতারকুলের বাসায় গিয়ে অস্ত্র জমা দিয়ে আত্মগোপনে চলে যান।
ডিবির যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম বলেন, ‘এই হত্যার ঘটনাটি একেবারে সূত্রহীন ছিল। ডিবির একজন কর্মকর্তার বুদ্ধিদীপ্ত তদন্তে খুনের রহস্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয়েছে।’ তিনি আরও জানান, তদন্ত শিগগিরই শেষ করে এই মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হবে।



