ঈদযাত্রায় নিরাপত্তা জোরদারে হাইওয়ে পুলিশের বিশেষ উদ্যোগ
আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে বাস, ট্রেন ও নৌপথে অগ্রিম টিকিট বিক্রি প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রতিবছরের মতো এবারও নিরাপদ ঈদযাত্রা নিয়ে যাত্রীদের মধ্যে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে মহাসড়কে যানজট, ছিনতাই ও দুর্ঘটনার কারণে যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক রয়েছে। যদিও এবার এখন পর্যন্ত বড় ধরনের ডাকাতির ঘটনা কম, তবুও দূরপথে যাত্রা নির্বিঘ্ন হবে কি না, এ নিয়ে জনমনে উদ্বেগ বিদ্যমান।
হাইওয়ে পুলিশের ব্যাপক প্রস্তুতি
ঈদ উপলক্ষে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করতে হাইওয়ে পুলিশ ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। মহাসড়কে যানজট নিরসন, দুর্ঘটনা রোধ এবং ছিনতাই-ডাকাতি মোকাবিলায় এবারের ঈদযাত্রায় নতুন ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। হাইওয়ে পুলিশ জানিয়েছে, মহাসড়কে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কুইক রেসপন্স টিম গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের প্রতিটি অংশকে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা (সিসিটিভি) নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। এছাড়া প্রথমবারের মতো গাজীপুরের চন্দ্রা এলাকাজুড়ে সিসিটিভি স্থাপন করা হয়েছে। মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে থাকা খানাখন্দের বেশিরভাগই সড়ক বিভাগের মাধ্যমে মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মহাসড়কে যানজট ও থ্রি-হুইলার নিয়ন্ত্রণ
হাইওয়ে পুলিশ জানায়, বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) থেকে হাইওয়ে পুলিশ মাদারীপুর রিজিয়ন ও ফরিদপুর অঞ্চলের উদ্যোগে মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পয়েন্টে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। তবে মহাসড়কে চলাচলের বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে অবৈধ থ্রি-হুইলার বা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। জব্দ ও মামলা দেওয়া হলেও এগুলোর চলাচল পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ মহাসড়কের পাশে অসংখ্য গ্রামীণ সড়ক রয়েছে, যেখান থেকে থ্রি-হুইলারগুলো হঠাৎ করে মহাসড়কে উঠে পড়ে। এ বিষয়ে হাইওয়ে পুলিশ জানিয়েছে, থ্রি-হুইলার নিয়ন্ত্রণকারী সংগঠনগুলোর সঙ্গে ইতোমধ্যে আলোচনা করা হয়েছে। তারা ঈদের সময় মহাসড়কে এসব যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে।
ব্ল্যাক স্পট ও যানজট নিরসনে উদ্যোগ
হাইওয়ে পুলিশ সদর দফতরের ডিআইজি (প্রশাসন) ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, "দেশের প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার মহাসড়কে ঈদযাত্রা নিরাপদ রাখতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।" তিনি জানান, মহাসড়কে বর্তমানে ২০৭টি ব্ল্যাক স্পট বা দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত রয়েছে। এর মধ্যে ৩১টি রাস্তার রক্ষণাবেক্ষণসংক্রান্ত সমস্যা এবং প্রায় ৪৯টি হাটবাজার রয়েছে, যা যানজটের অন্যতম কারণ। তিনি বলেন, "যেসব স্থানে সড়ক নির্মাণ কাজ চলছে, সেখানে হাইওয়ে পুলিশ অতিরিক্ত জনবল দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে কাজ দ্রুত শেষ করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয়েছে। আর হাটবাজারগুলোর বিষয়ে জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে সমাধান করতে বলা হয়েছে।"
কুইক রেসপন্স টিম ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার
ডিআইজি ইমতিয়াজ আহমেদ জানান, এবারের ঈদযাত্রায় নতুন উদ্যোগ হিসেবে কুইক রেসপন্স টিম গঠন করা হয়েছে। হাইওয়ে পুলিশের মোট ৮০টি থানার মধ্যে অনেক থানার পক্ষে সব ব্ল্যাক স্পটে দ্রুত পৌঁছানো সম্ভব হয় না। আবার টহল গাড়িও সবসময় এসব স্থানে যেতে পারে না। এজন্য মোট ৬৬টি কুইক রেসপন্স টিম গঠন করা হয়েছে। তিনি বলেন, "এই টিমগুলো মোটরসাইকেলে টহল দেবে। কোথাও দুর্ঘটনা ঘটলে, গাছ ভেঙে পড়ে রাস্তা বন্ধ হলে বা অন্য কোনও সমস্যা হলে তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে ব্যবস্থা নেবে।" মহাসড়কে থ্রি-হুইলার চলাচল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "এ বিষয়ে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে সমস্যা হলো মহাসড়কের পাশের গ্রামীণ সড়কগুলো। সেখান থেকে হঠাৎ করে থ্রি-হুইলার মহাসড়কে উঠে আসে। তবুও সামনে পড়লেই আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।"
সিসিটিভি নজরদারির বিষয়ে তিনি জানান, আগে নষ্ট থাকা বেশ কিছু ক্যামেরা মেরামত করা হয়েছে। বর্তমানে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে প্রায় ১ হাজার ৪৪০টি সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়েছে এবং সবগুলো সচল রয়েছে। তিনি বলেন, "এই মহাসড়কের প্রতিটি অংশ এখন সিসিটিভির মাধ্যমে নজরদারিতে রয়েছে। এছাড়া অন্য মহাসড়কেও ক্যামেরা বসানো হয়েছে। চন্দ্রা এলাকায় প্রায় চার কিলোমিটার অংশ নতুন করে সিসিটিভি’র আওতায় আনা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ জংশনগুলোতেও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে, যাতে কন্ট্রোল রুম থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।" হাইওয়ে পুলিশের প্রতিটি রিজিয়নেই এবার ড্রোন ব্যবহার করা হবে বলেও জানান তিনি।
ডাকাতি রোধ ও অপরাধীদের তালিকা
গত বছরের ঈদের আগে মহাসড়কে কয়েকটি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছিল। পরে কঠোর নজরদারি ও অভিযানের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। এবারও রাতের বেলায় অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করে পাহারার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। এদিকে ঈদযাত্রায় ডাকাতি ও ছিনতাই রোধে ২০০৫ সাল থেকে এখন পর্যন্ত মহাসড়কের বিভিন্ন অপরাধের ডেটা বিশ্লেষণ করে দেড় হাজারের বেশি অপরাধীর তালিকা তৈরি করেছে হাইওয়ে পুলিশ। ওই তালিকার ভিত্তিতে অভিযানের কথাও জানানো হয়েছে।
আনফিট বাস বন্ধে কঠোর অবস্থান
ঈদযাত্রায় যাতে লক্কড়-ঝক্কড় বা আনফিট বাস চলাচল না করে, সে বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এবং পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন হাইওয়ে পুলিশের কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, মহাসড়কে আনফিট বাস আটক করলে সেগুলো সরিয়ে রাখার জায়গা প্রয়োজন হয়। তাই বিআরটিএকে অনুরোধ করা হয়েছে আগেভাগেই এসব বাসের মালিকদের নোটিশ দিতে এবং ঈদের আগে থেকেই মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতে।
