সীতাকুণ্ডে যৌথ অভিযানে বিপুল অস্ত্র উদ্ধার, তিন মামলায় ২২ জন গ্রেপ্তার
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় যৌথবাহিনীর অভিযানে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র, গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনায় তিনটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। অস্ত্র ও বিস্ফোরক আইনে মামলাগুলো করা হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত এই ঘটনায় ২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার (১০ মার্চ) সকালে সীতাকুণ্ড থানায় পুলিশ বাদী হয়ে দুটি ও র্যাব বাদী হয়ে একটি মামলা করে। এরপর দুপুর দেড়টার দিকে চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে অভিযানের বিস্তারিত জানানো হয়।
উদ্ধারকৃত অস্ত্র ও সরঞ্জামের তালিকা
চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (শিল্পাঞ্চল ও ডিবি) মো. রাসেল জানান, অভিযানে উদ্ধারকৃত সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে:
- তিনটি আগ্নেয়াস্ত্র (একটি বিদেশি পিস্তল, একটি দেশীয় পিস্তল, একটি এলজি)
- ২৭টি পাইপগান
- ৩০টি পিস্তলের ম্যাগাজিন
- ৫৭টি অস্ত্র তৈরির পাইপ
- ৬১টি কার্তুজ
- মোট ১ হাজার ১১৩ রাউন্ড গুলি
তিনি আরও জানান, এছাড়া এই অভিযানে ১১টি ককটেল ও পাইপগান তৈরির লেদ মেশিনসহ বিপুল পরিমাণ অস্ত্র তৈরির সরঞ্জামও উদ্ধার করা হয়েছে। অস্ত্র ও বিস্ফোরক আইনে করা পুলিশ ও র্যাবের তিন মামলায় ইতোমধ্যে আটক ২২ জনকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।
গোলাবারুদের উৎস ও অভিযানের বিস্তারিত
সংবাদ সম্মেলনে র্যাব-৭-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান বলেন, উদ্ধার হওয়া গোলাবারুদের মধ্যে ৭.৬২ মিলিমিটার, ৯ মিলিমিটার ও .২২ বোরের গুলি রয়েছে। তিনি আরও বলেন, এ সব গোলাবারুদ সাধারণত মিয়ানমার সীমান্ত অঞ্চলে ব্যবহৃত হয় এবং এগুলো বাংলাদেশের কোনো সরকারি উৎস থেকে আসেনি। অভিযানে ধরা পড়ে যে, জঙ্গল সলিমপুরে অপরাধীরা একটি শক্তিশালী ‘হাব’ তৈরি করেছিল, যা ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আহসান হাবীব পলাশ বলেন, আপাতত জঙ্গল সলিমপুরে পূর্ণাঙ্গ থানা স্থাপনের পরিবর্তে একটি তদন্ত কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘থানা হওয়াই মূল বিষয় নয়, এলাকার ওপর প্রশাসনের কার্যকর নিয়ন্ত্রণই প্রধান লক্ষ্য।’
অভিযানের অংশগ্রহণকারী ও পরবর্তী পদক্ষেপ
চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ড. মুহাম্মদ জিয়াউদ্দিন বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসায় এখন ওই এলাকায় ঝুলে থাকা সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় কারাগার নির্মাণের বিষয়টিও রয়েছে। তিনি বলেন, সেখানে বসবাসকারী প্রায় এক লাখ মানুষের বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে আসা নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এর আগে, সোমবার ভোর সাড়ে ৫টা থেকে জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর অভিযান শুরু হয়েছিল। এতে অংশ নেন:
- বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ৪৮৭ জন
- জেলা পুলিশ ১৪৬ জন
- চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ ৮০০ জন
- আরআরএফ ৪০০ জন
- ফেনী জেলা পুলিশ ১০০ জন
- পার্বত্য জেলা ৩০০ জন
- এপিবিএন ৩৩০ জন
- বিজিবি ১২২ জন
- র্যাব ৩৭১ জন
মোট ৩,১৮৩ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী। এছাড়াও ৭ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এই অভিযানে দায়িত্ব পালন করেন। অভিযানে ব্যবহৃত হয় ৩টি হেলিকপ্টার, ১৫টি এপিসি, ৩টি ডগ স্কোয়াড ও ১২টি ড্রোন। চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আহসান হাবীব পলাশের নেতৃত্বে এই অভিযান পরিচালিত হয়। অতিরিক্ত ডিআইজি মো. নাজিমুল হক ও চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মাদ নাজির আহমেদ খান সরেজমিনে উপস্থিত থেকে অভিযান তদারকি করেন।
অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
অভিযান শেষে এলাকায় আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে এবং অপরাধীদের পুনরুত্থান ঠেকাতে দুটি অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। এস এম পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় ও আলী নগর উচ্চ বিদ্যালয় ক্যাম্পে মোট ৩৬০ জন সদস্য মোতায়েন রয়েছেন। র্যাব জানায়, এটি ছিল অভিযানের ‘ফেজ-১’ বা প্রবেশ পর্ব। বর্তমানে চলছে ‘ফেজ-২’, যা এলাকার প্রশাসনিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম।
