পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ১৭ বছর: শোক থেকে স্মরণের দিনে রূপান্তর
১৭ বছর আগে আজকের দিনে, ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি, রাজধানীর পিলখানায় সংঘটিত হয়েছিল এক নৃশংস সেনা হত্যাকাণ্ড। শোকাবহ সেই দিনটি এবার প্রথমবারের মতো ‘জাতীয় শহীদ সেনা দিবস’ হিসেবে পালিত হচ্ছে। একইসঙ্গে সরকার মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর) এর নাম ও ইউনিফর্ম পুনর্বহালের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা বর্তমানে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) নামে পরিচিত।
সেদিনের ভয়াবহতা: রক্তে রঞ্জিত পিলখানা
২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন বিডিআর সদর দফতরে বিদ্রোহের নামে চালানো হয় ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ। বার্ষিক দরবার চলাকালে শুরু হওয়া এ বিদ্রোহ দ্রুত রূপ নেয় রক্তক্ষয়ী তাণ্ডবে। মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদসহ ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা এবং নারী-শিশুসহ মোট ৭৪ জনকে হত্যা করা হয়। হত্যার পর লাশ গুম করতে অনেককে মাটিতে পুঁতে রাখা হয়, যা ঘটনার নৃশংসতাকে আরও গভীর করে তোলে।
বিডিআর নাম ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সীমান্ত অনুবিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বিজিবিকে পুনরায় বিডিআর নামে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এখনও শুরু হয়নি, তবে সংশ্লিষ্ট দফতর থেকে প্রস্তাব এলেই ফাইল প্রক্রিয়াকরণ শুরু হবে। এদিকে, নির্বাচনের আগে সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিজিবির আগের নামে ফেরত যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। পাশাপাশি পিলখানা হত্যাকাণ্ডের দিনটিকে জাতীয়ভাবে শোক দিবস হিসেবে ঘোষণার প্রতিশ্রুতিও দেন। সেই প্রতিশ্রুতিরই আংশিক বাস্তবায়ন হিসেবে ইতোমধ্যে দিনটি ‘জাতীয় শহীদ সেনা দিবস’ ঘোষণা করা হয়েছে।
নতুন তদন্তের ঘোষণা: পূর্ববর্তী রিপোর্টে আস্থাহীনতা
পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পেছনের ষড়যন্ত্র নিয়ে আবারও নতুন করে তদন্তের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, পূর্ববর্তী তদন্ত প্রতিবেদনে সরকারের আস্থা নেই। তাই নতুন তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করা হবে। এর আগে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত ‘জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন’ তাদের প্রতিবেদনে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতার সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে। প্রতিবেদনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন, শেখ ফজলে নূর তাপস, মির্জা আজম, জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ কয়েকজন নেতার নাম উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি প্রতিবেশী একটি রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্টতার কথাও বলা হয়। তবে, বর্তমান সরকার সেই রিপোর্ট গ্রহণ করেনি।
সেনাপ্রধানের বক্তব্য ও বিচারিক প্রক্রিয়া
পিলখানা হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান বলেছেন, “এই বর্বরতা কোনও সেনাসদস্য করেনি। তৎকালীন বিডিআর সদস্যদের দ্বারাই সংঘটিত হয়েছে। বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং তা ব্যাহত করা উচিত নয়।” ঘটনার সময় সেনাপ্রধান ছিলেন সাবেক সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদ। পরবর্তীতে তিনি এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেন, তদন্তে সরকার যথাযথ সহায়তা করেনি। ‘জাতীয় শহীদ সেনা দিবস’ উপলক্ষে রাষ্ট্রীয়ভাবে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। পৃথক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শহীদ সেনা সদস্যদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন এবং তাদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
মামলার বর্তমান অবস্থা: আদালত থেকে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত
ওই নৃশংস ঘটনায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি পৃথক মামলা হয়। বিস্ফোরক মামলাটি এখনও বিচারিক আদালতে চলমান। তবে, হত্যা মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষে ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. আখতারুজ্জামান বকশীবাজারের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে স্থাপিত অস্থায়ী এজলাসে রায় ঘোষণা করেন। পিলখানা বিদ্রোহের ঘটনায় সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে হত্যার দায়ে ১৫২ আসামির ফাঁসির রায় দেন এ বিচারক। রায়ে তিনি বলেছিলেন, “দেশের সামরিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ধ্বংসের উদ্দেশে পিলখানায় সেই বিদ্রোহ ঘটানো হয়েছিল।” ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রির মতো কাজে বিডিআরকে জড়ানো ঠিক হয়নি বলেও রায়ের পর্যবেক্ষণ জানিয়েছিলেন তিনি।
এরপর নিয়ম অনুসারে মামলার রায়ের সব নথিসহ আসামিদের ডেথ রেফারেন্স ও আপিল হাইকোর্টে আসে। সেসব আবেদনের শুনানি শেষে ২০১৭ সালের ২৬ ও ২৭ নভেম্বর টানা দু’দিনে পিলখানা হত্যাকাণ্ডের মামলায় হাইকোর্ট রায় ঘোষণা করেন। হাইকোর্টের রায়ে বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের ১৫২ আসামির মধ্যে ১৩৯ জনের ফাঁসির রায় বহাল রাখা হয়। একইসঙ্গে আটজনের মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন ও চার জনকে খালাস দেওয়া হয়। এ মামলার অন্যতম আসামি বিএনপি নেতা নাসিরউদ্দিন পিন্টু হাইকোর্টে বিচার চলাকালীন মারা যান।
পাশাপাশি বিচারিক আদালতে যাবজ্জীবন পাওয়া ১৬০ জন আসামির মধ্যে ১৪৬ জনের সাজা বহাল রাখেন হাইকোর্ট। তাদের মধ্যে দুই আসামি মারা যান এবং ১২ জনকে খালাস দেওয়া হয়। এছাড়া জজ আদালতে খালাস পাওয়া ৬৯ আসামির মধ্যে রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের প্রেক্ষিতে ৩১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। হাইকোর্টের রায়ের পর থেকে এ পর্যন্ত সাজাপ্রাপ্ত সব আসামি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল দায়ের করেছেন বলে জানিয়েছেন তাদের অন্যতম আইনজীবী মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, “আপিল বিভাগে আবেদন জানান সাজাপ্রাপ্ত আসামি ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা। ফলে এখনও শুনানির জন্য অপেক্ষমাণ রয়ে গেছে গুরুত্বপূর্ণ এ মামলার আপিল বিভাগের বিচার।”
