পুলিশের প্রতি জনআস্থা পুনর্গঠনে নতুন মন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি, কিন্তু বাস্তবতা কী?
পুলিশের জনআস্থা পুনর্গঠন: প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা

পুলিশের প্রতি জনআস্থা পুনর্গঠনে নতুন মন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি, কিন্তু বাস্তবতা কী?

দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশ বাহিনীর ওপর জনগণের আস্থা পুনর্গঠনে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এই প্রতিশ্রুতি আগে অন্তর্বর্তী সরকারও দিয়েছিল। কিন্তু মাঠপর্যায়ে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন স্পষ্ট না হওয়ায় এখন প্রশ্ন উঠেছে, কীভাবে বাস্তবে পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরবে? আর কীভাবে চাপে থাকা এই বাহিনীর ভেতরের মনোবল পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে?

কেন তৈরি হয়েছে আস্থার সংকট?

রাজনৈতিক অস্থিরতা, নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা, ভুয়া ও পাল্টা মামলার প্রবণতা এবং আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগসহ নানা কারণে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে উঠেছিল। এই পরিস্থিতির জের ধরে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের পর পুরো পুলিশ বাহিনী প্রায় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রচেষ্টায় পুলিশ বাহিনী কাজে ফিরে এলেও সদস্যদের মনোবল ভেঙে পড়েছে। বিভিন্ন স্থানে দায়িত্ব পালনের সময় পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে। এসব কারণে তৈরি হয়েছে এক দ্বিমুখী সংকট। একদিকে জনআস্থা কমেছে, অপরদিকে বাহিনীর ভেতরে সিদ্ধান্তহীনতা ও অনিশ্চয়তা বেড়েছে।

মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, অভিযানে গেলে এখন ‘ভিডিও ট্রায়াল’ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ‘তাৎক্ষণিক বিচার’ নিয়ে অতিরিক্ত সতর্ক থাকতে হয়। স্পষ্ট নীতিমালা ও রাজনৈতিক সমর্থনের অভাব সিদ্ধান্ত গ্রহণকে জটিল করে তোলে। পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা মনে করেন, পুলিশের আস্থা ফেরাতে হলে প্রথম শর্ত রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত কর্মপরিবেশ। নিরপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগের নিশ্চয়তা না থাকলে প্রকৃত আস্থা তৈরি হয় না।

বিশ্লেষকদের মতামত ও সমাধানের পথ

বিশ্লেষকরা মনে করেন, জনআস্থা ফেরাতে রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি। এছাড়া অভিযোগ তদন্তে দ্রুত ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা জনআস্থা বাড়ায়। একইসঙ্গে মিথ্যা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ থেকে সদস্যদের সুরক্ষা দিতে হবে। পুলিশ সদস্যদের ঝুঁকিভাতা, আবাসন সুবিধা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সেলিংয়ের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পেলে বাহিনীর ভেতরের আত্মবিশ্বাস বাড়বে। ডিজিটাল অপরাধ, ভুয়া তথ্য মোকাবিলা, মানবাধিকার সম্মত পুলিশিংয়ের বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ অপরিহার্য। মাঠ পর্যায়ে জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ও অংশীদারত্ব বাড়াতে কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম সক্রিয় করতে হবে জনআস্থা বাড়াতে হলে।

প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার মধ্যে ফারাক

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও ‘আস্থা পুনর্গঠন’ ছিল বহুল উচ্চারিত শব্দ। তবে রাজনৈতিক সংঘাত, মামলা বৃদ্ধি এবং বাহিনীর ওপর বহুমুখী চাপের কারণে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসেনি। নতুন রাজনৈতিক সরকারের সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ। একদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা, অপরদিকে বাহিনীর ভেতরে পেশাগত আত্মবিশ্বাস ও বাইরে জনআস্থা ফিরিয়ে আনা।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসার্স কল্যাণ সমিতির এক অনুষ্ঠানে পুলিশের আইজি বাহারুল আলম বলেছিলেন, ‘‘২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে পুলিশ ফ্যাসিস্ট সরকারের লাঠিয়াল হয়ে উঠেছিল। তখন পুলিশের নেতৃত্ব স্তর ভেঙে পড়েছিল, জনআস্থা থেকে পুলিশ ছিটকে পড়েছিল বলে জনগণের কাছে পুলিশকে গ্রহণযোগ্য করে তোলাই হচ্ছে চ্যালেঞ্জ।’’

পুলিশের সঙ্গে জনগণের আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলার কোনও বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. মো. তৌহিদুল হক। তিনি বলেন, ‘‘অতীতে বিভিন্ন সরকার পুলিশ ও জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের কথা বললেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই পুলিশকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে। এর ফলে পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং জনগণের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছে।’’

তৌহিদুল হক আরও বলেন, ‘‘চব্বিশের ৫ আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক সরকারের মধ্যে এমন মানসিকতা তৈরি হবে, যেখানে পুলিশ দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী কাজ করবে এবং সরকার সেই কাজ পরিচালনায় প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেবে।’’ পুলিশের পেশাদারত্ব নিশ্চিত করতে যথাযথ প্রশিক্ষণ, প্রস্তুতি, আধুনিক উপকরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা জরুরি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, ‘‘শুধু মুখের বক্তব্য বা প্রতিশ্রুতি দিয়ে আস্থা ফেরানো সম্ভব নয়। কর্মের মাধ্যমে পুলিশকে প্রমাণ করতে হবে যে, তারা জনগণের বন্ধু। অতীতে কিছু কর্মকর্তা ক্ষমতাসীন দলের কর্মীসুলভ আচরণ করে পুরো বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছেন। হাতে গোনা কয়েকজনের রাজনৈতিক সুবিধাবাদী আচরণের কারণে পুরো পুলিশ বাহিনী জনগণের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। ভবিষ্যতে যাতে এমন পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সে বিষয়ে সরকার ও পুলিশের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব, উভয়কেই সতর্ক থাকতে হবে। তারা যদি দলীয় আনুগত্যের ঊর্ধ্বে থেকে আইন অনুযায়ী কাজ করেন, তবেই পুলিশের প্রতি নতুন আস্থার জায়গা তৈরি হবে।’’

পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বক্তব্য

পুলিশের অতিরিক্ত আইজি (প্রশাসন) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেছেন, ‘‘পুলিশ আগের তুলনায় অনেক বেশি জনবান্ধব হয়েছে। কিছু অসঙ্গতি বা আগের মতো কিছু সমস্যা এখনও থাকলেও সেগুলো যথাযথ মনিটরিংয়ের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা চলছে।’’ পুলিশের এই শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ‘‘নিয়মিত ও মানসম্মত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পুলিশ সদস্যদের মনোবল আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়েছে।’’ পাশাপাশি হারানো ভাবমূর্তিও অনেকটাই পুনরুদ্ধার হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘‘পুলিশের পেশাদারত্ব ও জনআস্থা আরও বাড়াতে কাজ অব্যাহত রয়েছে।’’

সর্বোপরি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি আশার আলো দেখালেও, বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক ইচ্ছা, পেশাদারিত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনগণ ও পুলিশ বাহিনী উভয়ের আস্থা ফিরে পেতে সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।