রমজানে সড়কে ইফতার, পরিবারের বদলে দায়িত্বই সঙ্গী ট্রাফিক পুলিশের
রমজানে সড়কে ইফতার, দায়িত্বই সঙ্গী ট্রাফিক পুলিশের

রমজানে সড়কে ইফতার: ট্রাফিক পুলিশের নিষ্ঠা ও ত্যাগের প্রতিচ্ছবি

পবিত্র রমজান মাসের দ্বিতীয় দিন শুক্রবার। ইফতারের মাত্র ৩০ মিনিট আগে রাজধানীর বিজয় সরণি সিগন্যালে গাড়ির চাপ কম থাকলেও ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা সড়কেই অবস্থান করছেন যানজট নিয়ন্ত্রণে। রাস্তা পার হয়ে পাশের ট্রাফিক পুলিশ বক্সে গিয়ে দেখা যায়, তিন সদস্য ইফতারি প্রস্তুত করছেন। এক পুলিশ সদস্য জানান, বিজয় সরণি সিগন্যালে দায়িত্বরত সবাই একসঙ্গে ট্রাফিক বক্সে ইফতার করবেন বলে প্রস্তুতি চলছে।

সোনারগাঁও সিগন্যালেও একই দৃশ্য

বিজয় সরণি থেকে সোনারগাঁও ট্রাফিক সিগন্যালে গিয়েও চোখে পড়ে অনুরূপ চিত্র। ইফতারের বাকি মাত্র ১০ মিনিট, সড়কে গাড়ির চাপ নেই। পুলিশ বক্সে ট্রাফিক সদস্যরা তড়িঘড়ি করে ইফতারি প্রস্তুত করছেন—বড় পাত্রে কেউ ছোলা ঢালছেন, কেউ মুড়ি মেশাচ্ছেন। প্রতিদিন এভাবেই ইফতার করতে হয় ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের, কখনো পুলিশ বক্সে দল বেঁধে, কখনো সড়কে দাঁড়িয়ে। গতকাল ছুটির দিন হওয়ায় বাড়তি চাপ না থাকলেও সাধারণ দিনে গাড়ির চাপ বেশি হলে এক হাতে ইফতারি খান, আরেক হাতে দেন সংকেত।

দায়িত্বই সবার আগে: পুলিশ সদস্যদের অনুভূতি

রাজধানীর বিজয় সরণি সিগন্যালে দায়িত্ব পালন করছিলেন সার্জেন্ট জোবায়ের হোসেন। রাস্তায় দাঁড়িয়ে ইফতার করতে কেমন লাগে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পরিবার ছাড়া ইফতার করতে তো খারাপ লাগেই। কিন্তু দায়িত্ব তো সবার আগে।’ অন্যদিকে, সোনারগাঁও ট্রাফিক সিগন্যালে দায়িত্বরত ট্রাফিক সার্জেন্ট জয়নুল আবেদীন জানান, ‘ট্রাফিক বক্সে সবাই মিলে ইফতার করি, ভালোই লাগে। ২৫ বছর ধরে চাকরি করছি, এভাবেই তো চলছে।’

ডিএমপির ব্যবস্থাপনা ও বরাদ্দ

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বেলা ২টা এবং বেলা ২টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত দুই পালায় ট্রাফিক সদস্যরা সড়কে দায়িত্ব পালন করেন। বিকেলে যাঁদের দায়িত্ব পড়ে, তাঁদেরকে পুলিশের পক্ষ থেকে ইফতারি সরবরাহ করা হয়। রাজধানীর বিজয় সরণি, কারওয়ান বাজারসহ ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ সিগন্যালে সার্বক্ষণিক ট্রাফিক সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন, এক দিন পরপর একেকজনের বিকেলে দায়িত্ব পড়ে।

এ বিষয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান বলেন, ‘ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের ইফতারের জন্য একটা বিশেষ বরাদ্দ থাকে। সেই বরাদ্দ থেকেই ইফতার সরবরাহ করা হয়। বিকেলের পালায় রাজধানীতে প্রায় ২ হাজার ৩০০ ট্রাফিক সদস্য দায়িত্ব পালন করেন, এর বাইরে আরও ৫০০ ট্রাফিক সহায়তাকারী থাকেন। ইফতারের আগেই তাঁদের কাছে খাবারের প্যাকেট পৌঁছে দেওয়া হয়।’

পুলিশ সদস্যদের অভিজ্ঞতা ও অভ্যাস

বিজয় সরণি সিগন্যাল থেকে ফার্মগেট সড়কের পাশের কলমিলতা কাঁচাবাজারে ভ্রাম্যমাণ দোকান থেকে ইফতারি কিনছিলেন পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক (এসআই) মো. শামীম মন্ডল। তিনি জানান, পুলিশের পক্ষ থেকে ইফতারির প্যাকেট দেওয়া হয়েছে, পাশাপাশি আরও কিছু পছন্দের খাবার কিনে রাস্তায়ই সবাই মিলে ইফতার করবেন। পরিবার ছাড়া ইফতার করতে কষ্ট লাগে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘প্রথম প্রথম খারাপ লাগত। এখন আর কিছু মনে হয় না। অভ্যাস হয়ে গেছে। পরিবার ছেড়ে ইফতার করতে করতে পাথর হয়ে গেছি।’

সোনারগাঁও সিগন্যালে দায়িত্ব পালন করছিলেন সার্জেন্ট মো. আশিক। তিনি উল্লেখ করেন, রোজায় সোনারগাঁও সিগন্যালে সারা দিন প্রচণ্ড চাপ থাকে, সন্ধ্যায় যা আরও বাড়ে। চাপ থাকলে তাঁরা রাস্তায়ই ইফতার করেন, তবে গতকাল সবাই মিলে পুলিশ বক্সে ইফতার করেছেন।

ট্রাফিক পুলিশের ত্যাগ ও সমাজসেবা

সড়কে ইফতার নিয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান বলেন, ‘সবার যখন অফিস শেষে বাসায় ফেরেন, ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা তখন সড়কে যানজট নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত থাকেন। একটাই চেষ্টা থাকে নগরবাসী যাতে নির্বিঘ্নে পরিবারের সঙ্গে ইফতার করতে পারেন। পরিবারের সঙ্গে সবার ইফতার নিশ্চিত করতে গিয়ে ট্রাফিক সদস্যরা রাস্তায়ই ইফতার করেন। এটা জীবনের অংশ হয়ে গেছে।’

এই প্রতিবেদনটি ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের অক্লান্ত পরিশ্রম, নিষ্ঠা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তুলে ধরে, যা রমজান মাসে তাদের ত্যাগকে আরও মহিমান্বিত করে।