মোহাম্মদপুর-আদাবরে কিশোর গ্যাংয়ের আতঙ্ক: ছিনতাই ও হত্যাকাণ্ডে এলাকাবাসী আতংকিত
মোহাম্মদপুর-আদাবরে কিশোর গ্যাংয়ের আতঙ্ক, ছিনতাই-হত্যাকাণ্ড

মোহাম্মদপুর-আদাবরে কিশোর গ্যাংয়ের আতঙ্ক: ছিনতাই ও হত্যাকাণ্ডে এলাকাবাসী আতংকিত

ঢাকার মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় সন্ধ্যার পর পালটে যায় পুরো এলাকার চিত্র। প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি পর্যন্ত সব জায়গাতেই সক্রিয় হয়ে ওঠে ছিনতাইকারীরা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নানামুখী তৎপরতা ও কয়েক হাজার গ্রেফতারের পরেও অপরাধ কমছে না, বরং এলাকাটি অপরাধের 'হটস্পট' হিসেবে রয়ে গেছে। কিশোর গ্যাংয়ের আধিপত্য, ছিনতাই, চাঁদাবাজির ঘটনায় এখানকার বাসিন্দারা দৈনন্দিন আতংকে থাকেন।

কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণের বাইরে

কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা যেন দিন দিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। সম্প্রতি দুই গ্রুপের দ্বন্দ্বে ইমন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আবারও আলোচনায় এসেছে মোহাম্মদপুরের কিশোর গ্যাং সমস্যা। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, মোহাম্মদপুরে এখন অর্ধশত অপরাধী দল সক্রিয়। এর মধ্যে বড় অপরাধী দল ১৭টি। প্রতিটি দলে ১৫ থেকে ২০ জন করে অপরাধী রয়েছে, যা এলাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

পটপরিবর্তনের পর নতুন গ্যাংয়ের উত্থান

সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এলাকায় কিশোর গ্যাংগুলোর নেতৃত্ব ও আনুগত্যে পরিবর্তন আসে। কেউ দল বদল করেছে, কেউ নতুন নেতৃত্বে যুক্ত হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতার সুযোগে গড়ে ওঠে এসব নতুন নতুন গ্যাং। ফলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বেগ পেতে হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। গ্যাংগুলোর নিজেদের সংঘর্ষ, শক্তি প্রদর্শন এবং প্রকাশ্য ছিনতাইয়ের সিসিটিভি ফুটেজ জনমনে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। গত এক বছরে কিশোর গ্যাং সংশ্লিষ্ট সহিংসতায় অন্তত তিনজন নিহত ও ১৫ জনের বেশি গুরুতর আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সন্ধ্যার পর বদলে যায় এলাকার চিত্র

মোহাম্মদপুরের প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি, সব জায়গাতেই সক্রিয় ছিনতাইকারীরা। বিশেষ করে রিকশাযাত্রী, শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী মানুষ তাদের প্রধান টার্গেট। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ছুটির সময় মোবাইল ফোন, ব্যাগ ও ল্যাপটপ ছিনতাইয়ের ঘটনা বেশি ঘটে, যা নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।

গ্যাং দ্বন্দ্ব ও ইমন হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত

পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অ্যালেক্স ইমন গ্রুপের বিরুদ্ধে ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও মাদক কারবারের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। ছিনতাইয়ে বাধা পেলে কুপিয়ে জখম করতেও দ্বিধা করে না তারা। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে গ্যাংগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ প্রায় নিয়মিত ঘটনা। ২০২৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর দুই গ্যাংয়ের সংঘর্ষে দুজন নিহত ও কয়েকজন আহত হন। ইমন একটি বাহিনীর সোর্স হিসেবে কাজ শুরু করার পর এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে বলে জানা গেছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের মোহাম্মদপুর জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার জুয়েল রানা জানান, ইমন হত্যার ঘটনায় তার মা মোছা. ফেরদৌসী বাদী হয়ে মামলা করেছেন। মামলায় ২১ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরো ১০ থেকে ১২ জনকে আসামি করা হয়েছে। এ পর্যন্ত এজাহারভুক্ত আসামি সুমনসহ ৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে আরমান শাহরুখ গ্রুপের সদস্যদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। ইমনের বিরুদ্ধে হত্যাসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১৮টি মামলা রয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, গত এক বছরে বিভিন্ন অপরাধে মোহাম্মদপুর এলাকায় অন্তত তিন হাজার জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, কিন্তু তা অপরাধ দমনে পর্যাপ্ত প্রমাণিত হচ্ছে না।

একাধিক কিশোর গ্যাংয়ের সক্রিয়তা

মোহাম্মদপুরে একাধিক কিশোর গ্যাং সক্রিয়। এর মধ্যে 'কবজি কাটা গ্রুপ' সবচেয়ে আলোচিত ছিল। ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। গ্রুপ প্রধান আনোয়ার হোসেনসহ কয়েকজন গ্রেফতার হওয়ার পর তাদের তৎপরতা কিছুটা কমে। তবে অ্যালেক্স ইমন গ্রুপ বেশি সক্রিয় ছিল। এছাড়া পাটালি গ্রুপ, বেলচা মনির, টুন্ডা বাবু, লও ঠেলা, কালা রাসেল, ল্যাংড়া হাসান ও ‘চেতাইলেই ভেজাল' নামে পরিচিত আরও কয়েকটি গ্যাংয়ের অস্তিত্বের কথা জানিয়েছেন পুলিশ সদস্যরা।

ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজান জানান, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে, কিন্তু স্থায়ী সমাধানের জন্য আরও কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন। এলাকাবাসীরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন যে, যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।