টেকনাফ সীমান্তে মিয়ানমারের বিমান হামলার ভিডিওটি পুরোনো ও ভুয়া
টেকনাফ সীমান্তে বিমান হামলার ভিডিওটি পুরোনো ও ভুয়া

‘টেকনাফ সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের বিমান হামলা! চলছে উত্তেজনা’—এমন দাবি করে ২১ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওটিতে নদীতে নোঙর করা একাধিক নৌযান, যানবাহন ও স্থাপনায় ভয়াবহ আগুন এবং আকাশজুড়ে ঘন কালো ধোঁয়া দেখা যায়।

ভিডিওটি কোথা থেকে এসেছে?

Crack Platoon Bangladesh নামের একটি ফেসবুক পেজে পোস্ট করা ভিডিওটি দেখা হয়েছে দেড় লাখের বেশিবার, পোস্টে প্রতিক্রিয়া পড়েছে প্রায় ৪ হাজার। এর আগে একই দাবি তুলে ভারতের রিপাবলিক টিভিসহ বাংলাদেশের একাধিক অনলাইন সংবাদমাধ্যম ভিডিওটি প্রকাশ করে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের পর সেটি দ্রুত বিশ্বাসযোগ্যতা পায় এবং ৫০টির বেশি ফেসবুক পেজ, অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে একই দাবি ছড়িয়ে পড়ে।

পোস্টগুলোর মন্তব্যের ঘরেও দেখা যায়, অনেকে ভিডিওটিকে টেকনাফ সীমান্তে চলমান পরিস্থিতির বাস্তব দৃশ্য বলে ধরে নিয়ে উদ্বেগ ও আতঙ্ক প্রকাশ করছেন। তবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, ভাইরাল ভিডিওটির সঙ্গে টেকনাফ সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারে সাম্প্রতিক বিমান হামলার কোনো সম্পর্ক নেই।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রকৃত ঘটনা কী?

ভিডিওটির কি-ফ্রেম নিয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে চলতি বছরের ২১ এপ্রিল ফেসবুকে Leakana Meas নামের এক ব্যবহারকারীর পোস্ট করা ৩৬ সেকেন্ডের একটি ভিডিও পাওয়া যায়। কম্বোডীয় ভাষায় লেখা ক্যাপশনের বাংলা করলে দাঁড়ায়, মিয়ানমারের হোমালিন বন্দরে একাধিক জ্বালানিবাহী ট্যাংকারে ভয়াবহ আগুন লেগেছে এবং এতে কয়েকজন নিহত হয়েছেন। ‘টেকনাফ সীমান্তে মিয়ানমারের বিমান হামলা’ দাবি করে যে ভিডিও এখন ছড়িয়েছে, তার সঙ্গে ওই ভিডিওর হুবহু মিল রয়েছে।

একই ঘটনার ভিডিও ও ছবি একাধিক অ্যাকাউন্টে ওই সময় পোস্ট করা হয়; যেখানে বলা হয়, মিয়ানমারের সাগাইং অঞ্চলের হোমালিন নদীবন্দরে জ্বালানি স্থানান্তরের সময় একটি তেলবাহী নৌযানে বিস্ফোরণের পর আগুন দ্রুত আশপাশের অন্যান্য নৌযান, যানবাহন ও বন্দরের অবকাঠামোতে ছড়িয়ে পড়ে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম কী বলছে?

ওই ঘটনার সূত্র ধরে অনুসন্ধানে তুরস্কের আনাদোলু নিউজ এজেন্সি, ভারতের ফার্স্টপোস্ট, বাংলাদেশের দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসসহ একাধিক সংবাদমাধ্যমে ২১ এপ্রিল প্রকাশিত প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো থেকে জানা যায়, মিয়ানমারের সাগাইং অঞ্চলের হোমালিন নদীবন্দরে জ্বালানি স্থানান্তরের সময় একটি তেলবাহী নৌযানে বিস্ফোরণ ঘটে। এরপর আগুন দ্রুত বন্দরে থাকা অন্যান্য নৌযান, যানবাহন ও স্থাপনায় ছড়িয়ে পড়ে। এতে অন্তত ২ জন নিহত এবং ১১ জন আহত হন। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে অগ্নিনির্বাপক বাহিনীকে দীর্ঘ সময় কাজ করতে হয়।

প্রচারিত দাবিতে ভিডিওটিকে টেকনাফ সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের বিমান হামলার দৃশ্য বলা হলেও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের কোথাও এমন উল্লেখ নেই। আর হোমালিন মিয়ানমারের সাগাইং অঞ্চলে, যা বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন রাখাইন প্রদেশে নয়।

টেকনাফ সীমান্তের প্রকৃত পরিস্থিতি

অন্যদিকে, টেকনাফ সীমান্তে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে দৈনিক প্রথম আলো ২ জুলাই ‘রাখাইনের মংডুতে চলছে বিমান হামলা, বিস্ফোরণে কাঁপছে টেকনাফ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু শহরতলিতে আরাকান আর্মির অবস্থান লক্ষ্য করে দেশটির সরকারি বাহিনী বিমান হামলা চালায়। পাল্টা হামলার ফলে বিস্ফোরণের বিকট শব্দ টেকনাফ সীমান্তেও শোনা যায় এবং সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তবে কোথাও টেকনাফ সীমান্তে প্রচারিত ভাইরাল ভিডিওটির সঙ্গে ওই হামলার কোনো সম্পর্কের উল্লেখ নেই।

অর্থাৎ টেকনাফ সীমান্তে সাম্প্রতিক বিমান হামলার দাবিতে যে ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, সেটি বাস্তবে চলতি বছরের ২১ এপ্রিল মিয়ানমারের হোমালিন নদীবন্দরে তেলের ট্যাংকারে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের পুরোনো ভিডিও। এর সঙ্গে সাম্প্রতিক সীমান্ত পরিস্থিতির কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।