নরসিংদীর রায়পুরার মেথিকান্দা রেলস্টেশনে হামলায় নিহত বাকপ্রতিবন্ধী নারীর প্রকৃত পরিচয় ও স্বজনের সন্ধান মিলেছে। শনিবার দুপুরে কবর জিয়ারত করতে আসা দুই স্বজন জানান, ওই নারী ববি বেগম নামে পরিচিত হলেও তাঁর প্রকৃত নাম ওয়াহিদা বেগম।
ওয়াহিদা বেগমের পরিচয় ও পরিবার
ওয়াহিদা বেগমের বাড়ি বগুড়ার গাবতলী উপজেলার রামেশ্বরপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ঘোন সাগাটিয়া গ্রামে। তিনি মৃত রহিম উদ্দিন প্রামাণিক ও মৃত আনিসা বিবি দম্পতির বড় মেয়ে। স্থানীয় ইউপি সদস্য, প্রতিবেশী, গাবতলী মডেল থানা ও ভৈরব রেলওয়ে থানার ওসি এই পরিচয় নিশ্চিত করেছেন।
প্রায় দুই যুগ আগে স্বামী-সন্তানের মৃত্যুর পর ঝগড়া করে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন ওয়াহিদা, পরে আর ফেরেননি। তাঁর মা-বাবা, চার ভাই ও চার বোনের মধ্যে এক ভাই ছাড়া সবাই বাকপ্রতিবন্ধী।
হামলার বিবরণ
৪ জুলাই রাত দুইটার দিকে মেথিকান্দা স্টেশনের পরিত্যক্ত এক কক্ষে ঘুমিয়ে থাকা ওয়াহিদা বেগমকে মারধর করে দীর্ঘদিনের জমানো টাকা লুট করে নিয়ে যায় একদল দুর্বৃত্ত। হামলায় তাঁর চোখ, মুখ ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাত করা হয়। ৭ জুলাই রাত সাড়ে ১১টার দিকে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে রাত সোয়া একটার দিকে নরসিংদী সদর হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়।
প্রথমে ওই নারীর লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফনের কথা ভাবা হয়েছিল। তবে স্থানীয় মানুষের অনুরোধে প্রশাসন, পুলিশ ও এলাকাবাসীর সহযোগিতায় স্টেশন–সংলগ্ন সামাজিক কবরস্থানে তাঁর দাফনের ব্যবস্থা করা হয়। এ ঘটনায় মেথিকান্দা স্টেশনমাস্টারের দায়ের করা মামলায় পাঁচজন গ্রেপ্তার ও কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
স্বজনদের বক্তব্য
গাবতলী মডেল থানার ওসি মো. রাকিব হোসেন বলেন, ‘ববি বেগম নামে যাঁকে বলা হচ্ছে, তিনিই ওয়াহিদা বেগম। প্রায় দুই যুগ আগে স্বামী-সন্তানের মৃত্যুর পর ঝগড়া করে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন তিনি, পরে আর ফেরেননি। মা-বাবা, চার ভাই এবং চার বোনের মধ্যে এক ভাই ছাড়া সবাই বাকপ্রতিবন্ধী।’
প্রতিবেশী এনামুল হক জানান, দরিদ্র পরিবারটির সবাই বাকপ্রতিবন্ধী। ২৫ বছর আগে ওয়াহিদা নিখোঁজ হন। এরপর খোঁজখবর করেও তাঁর হদিস পায়নি পরিবার। নরসিংদীতে মেথিকান্দা রেলস্টেশনে হামলা ও লুটের শিকার হয়ে খুন হওয়ার পর বিভিন্ন মাধ্যমে তাঁর ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর সেই ছবি দেখে স্বজন ও প্রতিবেশীরা ওয়াহিদাকে চিনতে পারেন।
ওয়াহিদার ভাগ্নি জামাই সৈকত ইসলাম বলেন, গত বৃহস্পতিবার রাতে ফেসবুকে ঘটনাটি দেখে তাঁর স্ত্রী নিহত নারীকে পরিচিত মনে হওয়ায় বাড়িতে সব আত্মীয়স্বজনদের ছবিটি পাঠানো হলে তাঁরাও নিশ্চিত হন। ভাগনে গোলাম রব্বানী জানান, ‘আমার মায়ের সঙ্গেই ঝগড়া করে বাড়ি ছেড়েছিলেন ওয়াহিদা খালা। ভিডিও কল করে বাড়ির সবাইকে খালার কবর তিনি দেখিয়েছি। আগামীকাল রোববার তাঁর ভাইবোনসহ আরও আত্মীয়স্বজন কবর জিয়ারত করতে আসবেন।’
দুই যুগের আশ্রয়
রেলওয়ে পুলিশ ও স্টেশন কর্তৃপক্ষ জানায়, দুই যুগ আগে এক দুপুরে মেথিকান্দা স্টেশনে থামা একটি ট্রেন থেকে নেমেছিলেন বাকপ্রতিবন্ধী ববি বেগম। এরপর আর কোথাও যাননি, স্টেশনটির পরিত্যক্ত একটি কক্ষ ছিল তাঁর আশ্রয়। বিনা বেতনে প্ল্যাটফর্ম ঝাড়ু দেওয়া ও শৌচাগার পরিষ্কারসহ বিভিন্ন পরিচ্ছন্নতার কাজ করতেন তিনি। কেউ খাবার দিতেন, কেউ ৫-১০ টাকা সহযোগিতা করতেন। ওই টাকা খরচ না করে দুই যুগ ধরে জমিয়েছিলেন। সেই টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য ওই নারীর ওপর হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা।
ভৈরব রেলওয়ে থানার ওসি মো. সাঈদ আহমেদ বলেন, ‘মেথিকান্দা রেলস্টেশনে নিহত নারীর নাম ওয়াহিদা বেগম। তাঁর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য আমরা নিশ্চিত হয়েছি।’



