অনলাইনে নারীকে 'দুশ্চরিত্রা' বলা ইসলামে গুরুতর অপরাধ: শায়খুল হাদিস
অনলাইনে নারীকে 'দুশ্চরিত্রা' বলা ইসলামে গুরুতর অপরাধ

ছবি: পেক্সেলস

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখা একটি মন্তব্য, একটি পোস্ট বা একটি শেয়ার মুহূর্তের মধ্যেই অসংখ্য মানুষের কাছে পৌঁছে যায় এবং কারও সম্মান, ব্যক্তিগত জীবন কিংবা সামাজিক অবস্থানকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে। তাই একজন মুসলমানের জন্য অনলাইন ও অফলাইন—উভয় ক্ষেত্রেই ভাষা ব্যবহারে সংযম, সতর্কতা ও সত্যনিষ্ঠা অপরিহার্য।

বিশেষ করে কোনো নারীকে প্রমাণ ছাড়া ‘দুশ্চরিত্রা’ বলা বা তাঁর চরিত্র নিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করা ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। কোরআন ও সুন্নাহ এ ধরনের অপবাদ থেকে কঠোরভাবে সতর্ক করেছে এবং মানুষের সম্মান রক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ইসলামে যৌন–চরিত্রের মর্যাদা

ইসলাম মানুষের জীবন, ধর্ম, বিবেক, সম্পদ ও বংশ—এই মৌলিক বিষয়গুলোর সুরক্ষাকে শরিয়তের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হিসেবে বিবেচনা করে। (ইমাম শাতিবি, আল-মুয়াফাকাত, ২/১৭) তাই কারও প্রতি ব্যভিচারের ইঙ্গিত করে সম্মানহানি করা বা তার যৌন চরিত্র নিয়ে ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলা ইসলাম কখনোই সমর্থন করে না।

মানুষ মৌলিকভাবে দায়মুক্ত

হানাফি ও অন্যান্য ফিকহের একটি প্রতিষ্ঠিত নীতি হলো, মানুষের মৌলিকতায় রয়েছে দায়মুক্তি। অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাকে নির্দোষ বলে গণ্য করা হবে। তাই কোনো নারীকে শুধু সন্দেহ, গুজব বা ব্যক্তিগত ধারণার ভিত্তিতে ‘দুশ্চরিত্রা’ বলা ফিকহেরর এই নীতিরও পরিপন্থী। (ইবনে নুজাইম, আল-আশবাহ ওয়ান-নাজায়ির, পৃ. ৫৮)

প্রমাণ ছাড়া ‘দুশ্চরিত্রা’ বলা

কোনো নারীকে ‘দুশ্চরিত্রা’, ‘চরিত্রহীনা’ বা এমন কোনো শব্দে সম্বোধন করা, যার মাধ্যমে তার প্রতি ব্যভিচার বা যৌন–অসচ্চরিত্রতার অভিযোগ বোঝানো হয়, ইসলামি শরিয়তের ভাষায় তা কাজ্‌ফ (ব্যভিচারের অপবাদ) হিসেবে গণ্য হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এ ধরনের অভিযোগকারী ব্যক্তি যদি শরিয়তসম্মত প্রমাণ, অর্থাৎ, চারজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী উপস্থাপন করতে না পারেন, তাহলে তিনি কাজ্‌ফের শাস্তির আওতাভুক্ত হতে পারেন।

আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘আর যারা সতী-সাধ্বী নারীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে, অতঃপর চারজন সাক্ষী উপস্থিত করতে পারে না, তাদেরকে আশি বেত্রাঘাত করো এবং কখনো তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করো না, আর তারাই ফাসিক।” (সুরা নুর, আয়াত: ৪)

নিশ্চয়ই একজন মানুষ এমন একটি শব্দ বলে, যার পরিণতি সে ভেবে দেখে না। অথচ সেই একটি শব্দের কারণে সে জাহান্নামে এমন দূরে পতিত হবে, যা পূর্ব ও পশ্চিমের দূরত্বের চেয়েও বেশি। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৭৭)

অতএব, অনুমান, গুজব, সামাজিক প্রচারণা বা ব্যক্তিগত ধারণার ভিত্তিতে কাউকে ‘দুশ্চরিত্রা’ বলা ইসলামে বৈধ নয়। মানুষের সম্মান নিয়ে এমন অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর বিষয় এবং এর জন্য কঠোর শাস্তির কথা কোরআনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অনলাইনেও একই নৈতিকতা

বর্তমানে অপবাদ শুধু মুখের কথায় সীমাবদ্ধ নয়। ফেসবুক, ইউটিউব, এক্স, ইনস্টাগ্রাম বা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখা মন্তব্য, স্ট্যাটাস, শেয়ার, ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট কিংবা ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্যও মানুষের সম্মান ক্ষুণ্ন করতে পারে।

ইসলামের দৃষ্টিতে অনলাইন ও অফলাইনের মধ্যে এ বিষয়ে কোনো পার্থক্য নেই। একজন মুসলমান যেখানে থাকবেন, সেখানেই তাকে সত্য ও ন্যায়ের অনুসারী হতে হবে।

আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা অধিকতর ধারণা থেকে বিরত থাকো, কিছু ধারণা পাপ। একে অপরের গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না এবং পরস্পরের নিন্দা করো না।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১২)

এই নির্দেশনা মুসলিমকে সন্দেহ, গুজব, কুধারণা এবং সম্মানহানিকর আলোচনা থেকে দূরে থাকার শিক্ষা দেয়।

ভাষার দায়বদ্ধতা

রাসুল (সা.) মানুষকে সাতটি ধ্বংসাত্মক পাপ থেকে সতর্ক করেছেন। এর মধ্যে একটি হলো, ‘সতী ও ইমানদার নারীদের প্রতি ব্যভিচারের অপবাদ আরোপ করা।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৭৬৬)

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই একজন মানুষ এমন একটি শব্দ বলে, যার পরিণতি সে ভেবে দেখে না। অথচ সেই একটি শব্দের কারণে সে জাহান্নামে এমন দূরে পতিত হবে, যা পূর্ব ও পশ্চিমের দূরত্বের চেয়েও বেশি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৭৭)

এ দুটি হাদিস থেকে বোঝা যায়, মানুষের মুখ থেকে বের হওয়া বা লিখিত প্রতিটি শব্দের জন্যও আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। এখানেই একজন মুসলিমের ডিজিটাল ভাষার দায়বদ্ধতা।

সমালোচনা বনাম অপবাদ

ইসলাম ভুলের সংশোধনের জন্য সমালোচনাকে নিষিদ্ধ করেনি। কিন্তু সমালোচনা ও অপবাদ এক বিষয় নয়। সমালোচনা ব্যক্তি ও সমাজকে সংশোধন ও সমৃদ্ধ করে আর অপবাদ শত্রুতা ও বিশৃঙ্খলা তৈরি করে।

কারও আচরণে আপত্তি থাকলে তা শালীন ভাষায় তুলে ধরা যায়, প্রয়োজন হলে আইনগত বা সামাজিক প্রক্রিয়ায় সমাধান চাওয়া যায়। কিন্তু যথাযথ প্রমাণ ছাড়া চরিত্র হনন ইসলামি নৈতিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তাই আজকের ডিজিটাল যুগে একজন মুসলিমের জন্য প্রশ্ন হওয়া উচিত—আমি যা লিখছি, তা কি সত্য? তা কি ন্যায়সংগত? তা কারও সম্মান নষ্ট করছে না তো?

কারণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখা শব্দ শুধু স্ক্রিনে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা মানুষের জীবনে ও সমাজে প্রভাব ফেলে এবং নৈতিক জবাবদিহির অংশ হয়ে যায় ইহকালে ও পরকালে।

সাব্বির খান আযহারী : শায়খুল হাদিস ও শিক্ষাসচিব, জামিয়া দারুল আরকাম আল ইসলামিয়া, ঢাকা