বুধবার ভোর ৪টায় নওগাঁর সাপাহার উপজেলার আদাতলা সীমান্তের ২৪৪/এমপি পিলার এলাকা দিয়ে ৯ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। তবে বিজিবি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের বাধায় তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারেনি। বিকাল ৫টা পর্যন্ত প্রায় ১৩ ঘণ্টা ধরে তারা শূন্যরেখায় অবস্থান করছে। তাদের মধ্যে তিন পুরুষ, তিন নারী ও তিন শিশু রয়েছে।
মানবিক সংকট ও স্থানীয়দের উদ্বেগ
স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য নুরুল ইসলাম বলেন, “ভোর রাত থেকে তারা খোলা আকাশের নিচে রয়েছেন। খাবার বা পানি কিছুই নেই। তপ্ত রোদের মধ্যে এভাবে থাকলে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।” সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দারা জানান, তাদের সঙ্গে কোনো খাবার বা পানি ছিল না, বিশেষ করে তিন শিশুর অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পুশইন ও পুশব্যাকের প্রেক্ষাপট
সম্প্রতি বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে পুশইন ও পুশব্যাক নিয়ে উত্তেজনা বেড়েছে। সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ১৭ জুন পর্যন্ত ২ হাজার ৩৬৯ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে; এর মধ্যে ২ হাজার ১৭৫ জনকে থানায় সোপর্দ, ১১ জনকে বিএসএফের কাছে ফেরত, এবং ১৮৩ জনকে পুশব্যাক করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকে ৩৬টি পুশইন চেষ্টা প্রতিরোধ করেছে বিজিবি।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও আইনি প্রক্রিয়া
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, রাষ্ট্র যদি কাউকে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ বা ‘নিজ দেশের নাগরিক’ দাবি করেও তাকে ফেরত পাঠানোর আগে ন্যূনতম আইনি প্রক্রিয়া মানতে হবে। পরিচয় যাচাই, কনস্যুলার যোগাযোগ, শুনানির সুযোগ, শিশু ও নারীসহ ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের সুরক্ষা যাচাই—এসব বাদ দিয়ে সীমান্তে মানুষ “ঠেলে দেওয়া” বা “ঠেলে ফেরত পাঠানো” কোনোভাবেই মানবিক বা আইনসম্মত সমাধান হতে পারে না।
বিজিবি-বিএসএফ বৈঠকে আলোচনা
১২ জুন দিল্লিতে ৫৭তম বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকে বিষয়টি উঠে। বিজিবি জানায়, ভারতের পক্ষ থেকে ভারতীয় নাগরিক, রোহিঙ্গা ও মিয়ানমারের নাগরিকদেরও বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। তারা দ্বিপক্ষীয় পদ্ধতি ও প্রটোকল মেনে যাচাইকৃত বাংলাদেশি নাগরিকদের ফেরত পাঠানোর আহ্বান জানায়। ভারতীয় অবস্থান হলো, তারা নথিহীন বিদেশিদের নিজস্ব আইনে ফেরত পাঠাচ্ছে; তবে প্রশ্ন হচ্ছে, সেই প্রক্রিয়া কি সঠিকভাবে অনুসৃত হচ্ছে?
মানবাধিকার সংগঠনের বক্তব্য
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) ভাষ্য অনুযায়ী, জিরো লাইনে নারী-শিশুসহ মানুষকে দীর্ঘ সময় আটকে রাখা মানবাধিকার লঙ্ঘন। পরিচয় ও নাগরিকত্বের সঠিক, স্বচ্ছ ও আইনসম্মত যাচাই ছাড়া কাউকে ঠেলে দেওয়া বা আটকে রাখা অগ্রহণযোগ্য।
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, “মানবাধিকার দৃষ্টিকোণ থেকে পুশ-ইন বা পুশব্যাক উদ্বেগজনক, কারণ এতে অনেক সময় ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে তাদের পরিচয়, নাগরিকত্ব, সুরক্ষার প্রয়োজন বা আশ্রয়প্রার্থীর মর্যাদা যাচাই ছাড়াই সীমান্ত পার করে দেওয়া হয়। এর ফলে শিশু, নারী, বয়স্ক, রোহিঙ্গা এবং সীমান্তের দরিদ্র জনগোষ্ঠী বিশেষ ঝুঁকিতে পড়ে।” তিনি আরও বলেন, “আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, এ ধরনের ঘটনায় স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও নথিভিত্তিক যাচাইপ্রক্রিয়া অনুসরণ করা উচিত, যার মধ্যে ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়া, পরিচয়পত্র যাচাই, সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে দেখা এবং আইনি সহায়তা ও আপিলের সুযোগ নিশ্চিত করা অন্তর্ভুক্ত।”



