‘ডেলিভারি রোগীকে খাল পার করে দিলো চট্টগ্রামবাসী’—এই ক্যাপশনে একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ৫১ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, বর্ষার প্রবল স্রোতে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা কাঁধে তুলে নিয়ে যাচ্ছেন ১০ থেকে ১৫ জন ব্যক্তি। করুণ আবহসংগীত–সংবলিত ভিডিওটির শুরুতে কয়েকজন অটোরিকশাটি কাঁধে তুলে স্রোত পার করেন, অপর প্রান্তে থাকা আরও কয়েকজন সেটি টেনে ওপরে তোলেন। তবে ভিডিওটিতে অটোরিকশার ভেতরে কোনো যাত্রী দেখা যায় না।
ভাইরাল ভিডিওর বিস্তার
প্রথম আলোর ফ্যাক্টচেকে জানা গেছে, ভিডিওটি চট্টগ্রামের নয়; বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারী ইউনিয়নের কাগজিখোলা–খোটাখালী ছড়ায় ধারণ করা হয়েছে। ৯ জুলাই সোনালী নিউজ নামে একটি ফেসবুক পেজ ভিডিওটি প্রকাশ করে। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ভিডিওটি ৬৭ লাখের বেশি বার দেখা হয়েছে, ৪ লাখ ৩৯ হাজারের বেশি প্রতিক্রিয়া, ১১ হাজারের বেশি মন্তব্য এবং প্রায় ২১ হাজার শেয়ার হয়েছে। ভিডিওটি ৫৫টির বেশি পেজ ও ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে পোস্ট করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে নিশ্চিত তথ্য
বাইশারী ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আনোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘৭ জুলাই বেলা সাড়ে ১১টার দিকে টানা বর্ষণে খোটাখালী ছড়ায় প্রবল স্রোতের মধ্যে স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় চারটি সিএনজি অটোরিকশা কাঁধে তুলে পার করা হয়। একই দিন সন্ধ্যায় পার করা হয় আরও একটি। মোট পাঁচটি সিএনজি অটোরিকশা স্থানীয় লোকজনের সহযোগিতায় ছড়া অতিক্রম করে। তবে কোনোটিতে প্রসূতি নারী ছিলেন না।’
কাগজিখোলা বাজারের ব্যবসায়ী মো. বেলাল বলেন, ‘ভিডিওটি বাস্তব হলেও এর সঙ্গে গর্ভবতী নারীকে হাসপাতালে নেওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুল তথ্য যুক্ত করে ঘটনাটি ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।’
স্থানীয় বিএনপি নেতা জিয়াউর রহমান ও বাবরও বলেন, ‘ভাইরাল ভিডিওটিকে বিকৃতভাবে প্রচার করা হয়েছে। বাস্তব ঘটনার সঙ্গে প্রসূতি নারী বহনের কোনো সম্পর্ক ছিল না।’
প্রশাসনের বক্তব্য
নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এনামুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রবল বর্ষণে খোটাখালী ছড়ার পানির স্রোত বেড়ে গেলে স্থানীয় লোকজন এভাবেই যানবাহন ও মালামাল পারাপার করেন। ভিডিওটি আমি দেখেছি। খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি সেখানে কোনো প্রসূতি নারী ছিলেন না।’
সেতুর অভাবে দীর্ঘদিনের ভোগান্তি
স্থানীয় সাংবাদিকেরা জানান, বর্ষা মৌসুমে খোটাখালী ছড়ার পানির স্রোত বেড়ে গেলে শুধু যানবাহন নয়, সাধারণ মানুষের চলাচলও মারাত্মক ব্যাহত হয়। স্থানীয় লোকজনকে বছরের পর বছর একই ঝুঁকি নিয়ে পারাপার করতে হচ্ছে। বহুদিন ধরে সেতুর দাবি জানানো হলেও এখনো তা বাস্তবায়িত হয়নি। এতে জরুরি রোগী, শিক্ষার্থী, কৃষক ও সাধারণ মানুষকে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় করে বিকল্প পথে চলাচল করতে হচ্ছে।
ভিডিও প্রকাশকারী পেজের বক্তব্য
ভাইরাল ভিডিওটির ক্যাপশনে উল্লেখিত তথ্যের বিষয়ে জানতে চাইলে সোনালী নিউজের বার্তা সম্পাদক সাজ্জাদ হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের চট্টগ্রাম প্রতিনিধি ভিডিওটি “ডেলিভারি রোগীকে খাল পার করে দিলো চট্টগ্রামবাসী”—এই দাবি উল্লেখ করে পাঠিয়েছিলেন। সেটাই আমরা প্রকাশ করেছি।’ তিনি স্বীকার করেন, ভিডিওটি যাচাই করা হয়নি এবং তথ্য সংশোধন করে নতুন প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।
অর্থাৎ ‘ডেলিভারি রোগীকে খাল পার করে দিলো চট্টগ্রামবাসী’—এই দাবিতে ভাইরাল ভিডিওটি বিভ্রান্তি তৈরি করছে। কাঁধে তুলে খাল পারের ঘটনাটি ঠিক হলেও তা চট্টগ্রামের নয় এবং সেখানে কোনো প্রসূতি নারী থাকার তথ্য প্রমাণিত নয়।



