ভারতের কারাগারে ১৮ বছর: সাজা শেষ হলেও মুক্তি পাচ্ছেন না বাদল ফরাজি, কেন?
বাদল ফরাজির মুক্তি পেতে বাধা: আইনি জটিলতা ও আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা

ভারতের কারাগারে ১৮ বছর: সাজা শেষ হলেও মুক্তি পাচ্ছেন না বাদল ফরাজি, কেন?

যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি বাদল ফরাজিকে বন্দি বিনিময় চুক্তির আওতায় ২০১৮ সালের জুলাই মাসে ভারত সরকার বাংলাদেশে ফেরত পাঠায়। ভারতীয় আদালতের নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২২ সালের ২০ জুলাই বাদল ফরাজির ১৪ বছরের সাজা পূর্ণ হয়েছে। আইন অনুযায়ী, ১৪ বছর সাজা ভোগের পর যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত যেকোনও আসামির মুক্তির জন্য ভারত সরকারের কাছে আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মুক্তির আবেদন পাঠানো হলেও তা মঞ্জুর হয়নি। ফলে দীর্ঘ অপেক্ষার পরও মুক্তি মেলেনি বাদল ফরাজির।

গণমাধ্যমে আলোচনা ও পরিবারের ক্ষোভ

সম্প্রতি বাদল ফরাজির মুক্তির বিষয়টি দেশের একাধিক গণমাধ্যমে গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে। এ নিয়ে বাদলের স্বজন, মানবাধিকারকর্মী এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মনে এখন একটিই প্রশ্ন— কেন মুক্তি পাচ্ছেন না বাদল ফরাজি, আর আইনি বাধাটাই বা কোথায়? বাদল ফরাজিকে মুক্তি না দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তার স্বজনেরা। মুক্তির বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা না পেলে কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন তারা। গত ৬ এপ্রিল দুপুরে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত এক মানববন্ধন থেকে এই আলটিমেটাম দেওয়া হয়। ‘ভুল বিচারে ১৮ বছর, ভারত থেকে বাংলাদেশ! বাদল ফরাজির মুক্তি কবে?’— এই স্লোগানকে সামনে রেখে কর্মসূচিটি পালিত হয়। পরিবার ও স্বজনদের দাবি, সাজা পূর্ণ হওয়ার পরও তাকে আটকে রাখা মানবাধিকারের লঙ্ঘন। এমন প্রেক্ষিতে, বাদল ফরাজির মুক্তি নিয়ে সৃষ্ট এই জটিলতার প্রকৃত কারণগুলো অনুসন্ধান করা হয়েছে এই প্রতিবেদনে।

যাবজ্জীবন কারাবাস নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের আইন যা বলে

বাংলাদেশের কারাবিধি ৫৬৯ অনুযায়ী, একজন যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির ২০ বছর সাজা পূর্ণ হলে সরকার বিশেষ বিবেচনায় তার মুক্তির আবেদন বিবেচনা করতে পারে। অপরদিকে ১৯৬১ সাল থেকে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড মানে আমৃত্যু কারাবাস। তবে ভারতীয় দণ্ডবিধি (আইপিসি) অনুযায়ী, যদি কোনও বন্দি ১৪ বছর সাজা খাটে, তবে সরকার বিশেষ বিবেচনায় তাকে মুক্তি দিতে পারে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বন্দি বিনিময় চুক্তিতে কী বলা আছে

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যমান বন্দি বিনিময় চুক্তির ৯ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনও দেশই অপর দেশের অনুমতি ছাড়া হস্তান্তরিত বন্দিকে মুক্তি দিতে পারবে না। এক্ষেত্রে বন্দির মুক্তির জন্য সংশ্লিষ্ট দেশকে লিখিত আবেদন করতে হবে এবং উভয় দেশের সম্মতি প্রয়োজন হবে।

মুক্তির পথে প্রধান বাধা যেখানে

ভারতের আদালতে ২০২২ সালের ২০ জুলাই বাদল ফরাজির ১৪ বছর সাজা পূর্ণ হওয়ায় তার মুক্তির জন্য দু’দফা ভারতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে চিঠি পাঠায় বাংলাদেশ। তবে এক্ষেত্রে বিপত্তি ঘটে অন্য জায়গায়। কারা অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, ভারতে আসামিদের মুক্তির বিষয়ে ‘রিভিউ বোর্ড’ বছরে মাত্র একবার সভায় বসে। বাদল ফরাজির ক্ষেত্রে আবেদনের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত দীর্ঘ ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পূর্ণ। আবেদনটি প্রথমে কারাগার থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, এরপর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হয়ে ভারতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে পৌঁছায়। সেখান থেকে ভারতের পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘুরে রিভিউ বোর্ডে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সভার নির্ধারিত তারিখ পার হয়ে যায়। ফলে আবেদনটি ওই বছরের জন্য বাতিল হয়ে যায়। এই সময়ক্ষেপণের কারণেই মূলত বাদল ফরাজির মুক্তির বিষয়টি বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

এ বিষয়ে কারা অধিদফতরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন) জান্নাতুল ফরহাদ বলেন, “বিশ্বের অধিকাংশ দেশের আইনেই যাবজ্জীবন মানে আমৃত্যু কারাবাস। বাংলাদেশে এরশাদ সরকারের আমলে করা বিধি অনুযায়ী এটি ৩০ বছর ধরা হয়, যার মধ্যে ২০ বছর সাজা খাটলে মুক্তির আবেদন করা যায়।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, অতীতে নাথুরাম গডসে বা ফুলন দেবীর মতো আলোচিত আসামিদেরও ভারত সরকার বিশেষ বিবেচনায় মুক্তি দিয়েছিল। বাদল ফরাজির বিষয়ে তিনি বলেন, “বাদলের জন্য বাংলাদেশ থেকে দু’বার আবেদন পাঠানো হয়েছে। তবে দুই দেশের আইনি প্রক্রিয়ার সমন্বয়হীনতায় তার মুক্তি মেলেনি। যেহেতু তাকে বন্দি বিনিময় চুক্তিতে আনা হয়েছে, তাই ভারতের অনুমতি ছাড়া আমাদের কিছু করার নেই। আমরা ভারতের অনুমতির অপেক্ষায় আছি।” ভারতের অনুমতি পেলে বাদলের মুক্তিতে কোন বাধা থাকবে না বলেও জানান তিনি।

কান্নায় কাটছে পরিবারের দিন

বাদল ফরাজির বড় বোন আকলিমা আক্তার বলেন, “বাদল সম্পূর্ণ নির্দোষ বলেই বন্দিবিনিময় চুক্তিতে ভারত সরকার তাকে বাংলাদেশে পাঠিয়েছিল। কিন্তু আমাদের সরকার আজও তাকে মুক্তি দেয়নি। ভারতীয় আইন অনুযায়ী চার বছর আগেই তার সাজা শেষ হয়েছে। আমার ভাইকে অন্যায়ভাবে আটকে রাখা হয়েছে।” আকলিমা আরও বলেন, “ছেলের মুক্তির পথ চেয়ে থাকতে থাকতে বাবা মারা গেছেন। মা শেফালি বেগমও এখন মৃত্যুশয্যায়। তিনি শেষবার ছেলেকে দেখার আকুতি জানাচ্ছেন। সরকার যেন আমার ভাইয়ের মুক্তির দ্রুত ব্যবস্থা করে।”

যেভাবে ফেঁসে যান বাদল ফরাজি

২০০৮ সালের ১৩ জুলাই তাজমহল দেখার উদ্দেশ্যে ভারতে গিয়েছিলেন বাদল ফরাজি। এর আগে মে মাসে দিল্লির অমর কলোনিতে এক বৃদ্ধা খুন হন। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেনাপোল সীমান্ত পার হওয়ার সময় ভারতীয় পুলিশ ‘বাদল সিং’ ভেবে ভুল করে বাদল ফরাজিকে গ্রেফতার করে। ২০০৮ সালের ২১ জুলাই আটকের পর ২০১৫ সালে দিল্লির আদালত তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। উচ্চ আদালতেও সেই রায় বহাল থাকে। দিল্লির তিহার কারাগারে বন্দি অবস্থায় বাদল মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক পাস করেন। সেখানে বন্দীদের কাউন্সেলিং করতে যাওয়া মানবাধিকারকর্মী রাহুল কাপুরের সঙ্গে কথা হয় বাদল ফরাজির। শুরু হয় ‘জাস্টিস ফর বাদল’ শীর্ষক একটি স্বাক্ষর সংগ্রহ কর্মসূচি। পরে বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় ২০১৮ সালে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। কিন্তু ২০২৪ সালেও আইনি গোলকধাঁধায় বন্দি হয়ে আছেন তিনি।