মানবাধিকার কমিশনের ক্ষমতা হ্রাস: ২০০৯ সালের আইনে ফিরে গেল সংসদ, বিরোধী দলের আপত্তি নাকচ
মানবাধিকার কমিশনের ক্ষমতা হ্রাস, ২০০৯ সালের আইনে ফিরল সংসদ

মানবাধিকার কমিশনের ক্ষমতা সংকুচিত: ২০০৯ সালের আইনে ফিরে গেল বাংলাদেশ

জাতীয় সংসদ গতকাল বৃহস্পতিবার একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (এনএইচআরসি) সম্পর্কিত অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ বাতিল করেছে। এর মাধ্যমে ২০০৯ সালের আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রণীত ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন’ পুনঃপ্রচলন করা হয়েছে। বিরোধী দলের তীব্র আপত্তি উপেক্ষা করে কণ্ঠভোটে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ ও পুনঃপ্রচলন) বিল পাস হয়েছে, যা রাষ্ট্রপতির অনুমোদন সাপেক্ষে গেজেট প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

কমিশনের স্বাধীনতা ও ক্ষমতা হ্রাসের দিকে যাত্রা

এই পরিবর্তনের ফলে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগের বাছাই কমিটিতে সরকারের প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। পূর্ববর্তী অধ্যাদেশে বাছাই কমিটিতে প্রধান বিচারপতির মনোনীত বিচারক, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, নাগরিক প্রতিনিধি, সাংবাদিক ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিসহ বহুস্তরীয় সদস্য থাকার বিধান ছিল। কিন্তু ২০০৯ সালের আইনে ফিরে যাওয়ায় এখন কমিটিতে স্পিকারের সভাপতিত্বে আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও সরকারি-বিরোধী দলের সদস্যদের প্রাধান্য থাকবে, যা কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

এছাড়াও, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা কমিশন হারাবে। ২০০৯ সালের আইন অনুযায়ী, কমিশন কেবল সরকারের কাছে প্রতিবেদন চাইতে পারবে এবং সুপারিশ দিতে পারবে, সরাসরি তদন্ত বা ব্যবস্থা গ্রহণের অধিকার থাকবে না। এটি মানবাধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের পশ্চাদপসরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিরোধী দলের তীব্র প্রতিবাদ ও আশঙ্কা

বিল পাসের সময় বিরোধী দল জাতীয় পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য আবুল হাসনাত (হাসনাত আবদুল্লাহ) জোরালো আপত্তি জানান। তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন যে, এই সিদ্ধান্ত মানবাধিকার কমিশনকে অতীতের রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের পথ খুলে দিচ্ছে। হাসনাত আবদুল্লাহ উল্লেখ করেন যে, ২০০৯ সালের আইন কার্যকর থাকাকালে কমিশনকে বিরোধী দল ও মত দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল, এবং বিএনপির বিরুদ্ধে দমন-পীড়নের বৈধতা উৎপাদন করেছিল।

তিনি আরও যোগ করেন যে, এই বিল শুধু মানবাধিকার কমিশন নয়, বরং গুম অধ্যাদেশ ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকারীদের দায়মুক্তির অধ্যাদেশের সঙ্গেও সম্পর্কিত, যা সরকারের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের সম্ভাবনা তৈরি করে।

আইনমন্ত্রীর ব্যাখ্যা ও সরকারের অবস্থান

বিরোধী দলের আপত্তির জবাবে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেছেন যে, অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশে দুর্বলতা ও অস্পষ্টতা রয়েছে, যা গুম কমিশন আইনকে দুর্বল করে দিতে পারে। তিনি দাবি করেন যে, অধ্যাদেশে তদন্তের সময়সীমা, জরিমানা আদায়ের প্রক্রিয়া ও আইনি কাঠামো স্পষ্ট না থাকায় তা ভুক্তভোগীদের জন্য আরেকটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের সমান।

আইনমন্ত্রী জানান, সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সঙ্গে পরামর্শ করে ভবিষ্যতে একটি নতুন ও শক্তিশালী আইন প্রণয়ন করা হবে, কিন্তু এর মধ্যবর্তী সময়ে বাংলাদেশ যাতে মানবাধিকার কমিশন শূন্য না হয়, সেজন্য ২০০৯ সালের আইন পুনঃপ্রচলন করা হচ্ছে। তিনি সরকারের মানবাধিকার রেকর্ডের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, এই সরকারের আমলে একজনও ক্রসফায়ার বা গুমের শিকার হয়নি, যা সরকারের প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন।

পরিবর্তনের মূল বিষয়গুলো

  • অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ বাতিল করে ২০০৯ সালের আইন পুনঃপ্রচলন।
  • চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগে বাছাই কমিটিতে সরকারি প্রভাব বৃদ্ধি।
  • আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্ত ক্ষমতা কমিশনের হাত থেকে ছিনিয়ে নেওয়া।
  • বিরোধী দলের আশঙ্কা: রাজনৈতিক দমন-পীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার।
  • আইনমন্ত্রীর দাবি: অধ্যাদেশে দুর্বলতা, নতুন আইন প্রণয়নের পরিকল্পনা।

এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের মানবাধিকার সুরক্ষা কাঠামোয় একটি বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে, যা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিতে পারে। কমিশনের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা ভবিষ্যতে কী দিকে মোড় নেবে, তা এখন সময়ই বলে দেবে।