সুজন সম্পাদকের জরুরি আহ্বান: জাতীয় সংকট মোকাবিলায় ঐক্য অপরিহার্য
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার দেশে বিরাজমান ভয়াবহ সংকটের কথা উল্লেখ করে জাতীয় ঐক্য গঠনের উপর জোর দিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনাবলী বাংলাদেশকে মারাত্মক সংকটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। যদিও এই সংকট আমাদের সৃষ্টি নয়, তবুও এর ভোগান্তি আমাদেরই সহ্য করতে হবে এবং উত্তরণের পথ খুঁজে বের করতে হবে।
গোলটেবিল আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য
বুধবার (৮ এপ্রিল) জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি আয়োজিত ‘অধ্যাদেশ বাতিল এবং গণভোট অস্বীকারের রাজনীতি: সংসদীয় স্বৈরতন্ত্রের যুগে বাংলাদেশ’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এসব মন্তব্য করেন। বদিউল আলম মজুমদার বলেন, একদিকে বহির্বিশ্বের সংকট আমাদের ওপর প্রভাব ফেলছে, অন্যদিকে আমরা নিজেরাই নতুন সংকট তৈরি করছি।
তিনি বিশেষভাবে গণভোটের রায় নস্যাৎ করা এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতকারী অধ্যাদেশগুলো বাতিল করার চেষ্টার কথা উল্লেখ করেন। দেশের মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। এই সমস্যা বাইরে থেকে সৃষ্টি হলেও আমরা নিজেরাই কিছু অপ্রয়োজনীয় সমস্যা তৈরি করছি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
গণভোট ও সংবিধান নিয়ে তীব্র সমালোচনা
গণভোট ও জুলাই জাতীয় সনদের প্রসঙ্গে সুজন সম্পাদক বলেন, যে গণভোট হয়েছে এবং জনগণ যে অনুমোদন দিয়েছে, সেটি শেষ কথা হওয়ার কথা ছিল এবং অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করার কথা বলা হয়েছিল। সংবিধানের দোহাই দিয়ে আপত্তি তোলাকে তিনি ‘খোঁড়া যুক্তি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
তিনি ১৯৯০ সালের উদাহরণ টেনে বলেন, শাহাবুদ্দিন আহমেদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হয়েছিলেন— তা কি সংবিধানে ছিল? তিনি আবার ফেরত গেলেন— সেটাও কি সংবিধানে ছিল? তখন ঐক্যমতের ভিত্তিতেই এটি হয়েছিল। তখন কয়েকটি দলের মধ্যে ঐক্যমত হয়েছিল যদিও জাতীয় পার্টি সেই ঐক্যমতের মধ্যে ছিল না। তবুও তিন জোটের রূপরেখার ভিত্তিতে বিষয়টি বাস্তবায়িত হয়েছিল যা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিতও ছিল না, কিন্তু জনগণের কল্যাণে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়েছিল।
নোট অব ডিসেন্ট ও সংখ্যাগরিষ্ঠতার যুক্তি
নোট অব ডিসেন্ট প্রসঙ্গে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নোট অব ডিসেন্ট মানে মাইনরিটি ভিউ বা সংখ্যালঘু মতামত। ১৪ দলের সংসদীয় কমিটিতে ১১ জন সরকারদলীয় ও ৩ জন বিরোধীদলীয় সদস্য থাকলে সিদ্ধান্ত তো সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতেই হবে। ঐকমত্য কমিশনের মেজরিটি ভিউটাই সিদ্ধান্ত, এবং সেটিই গণভোটে অনুমোদিত হয়েছে।
তিনি বলেন, এসব ক্ষণাযুক্তি আমার কাছে বোধগম্য নয়। এসব পদক্ষেপ আমাদের সংকটকে আরও ঘনীভূত করবে। তরুণদের নেতৃত্বে যে ঐক্যের মাধ্যমে আমরা স্বৈরাচারী ব্যবস্থা পতন ঘটিয়েছিলাম এবং নতুন ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছিলাম, সেই ঐক্য আজ ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এই অনৈক্য এবং অহেতুক বিভাজন আমাদের অর্জনকে নষ্ট করে দিতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।
সরকারের প্রতি জোরালো আহ্বান
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সরকার, সরকারদলীয় সংসদ সদস্য এবং নীতিনির্ধারকদের প্রতি অনুরোধ, আল্লাহর ওয়াস্তে জাতির মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি করুন। এই ভয়াবহ সময়ে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ঐক্য। না হলে আমরা আবারও সংকটের দিকে যাবো এবং এর ভয়াবহ পরিণতি জনগণসহ ক্ষমতাসীনদেরও ভোগ করতে হবে।
ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা কখনও কখনও অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায় ‘দ্য কার্স অব টু থার্ড মেজরিটি’। আমরা কি পুরোনো পথে হাঁটছি, নাকি উল্টো পথে যাচ্ছি, এটা ভাবার সময় এসেছে।
অন্যান্য বক্তাদের অংশগ্রহণ
ফরিদুল হকের সঞ্চালনায় এই গোলটেবিল আলোচনায় আরও বক্তব্য রাখেন:
- ব্যারিস্টার আবু হেনা রাজ্জাকী
- দিলারা চৌধুরী
- ফরিদা আখতার
- ফাহিম মাশরুর
- আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া
- সারজিস আলম
- সারোয়ার তুষার
- জাবেদ রাসিন
- মনিরা শারমিন সালেহউদ্দিন সিফাত
- আরমান হোসাইন
- মোল্লা মোহাম্মদ ফারুক এহসান
এই আলোচনায় অংশগ্রহণকারী সকল বক্তাই দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং জাতীয় সংকট মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেন।



