দিনাজপুরে অবহেলিত শহীদ আসাদুল্লাহর সমাধি: ইতিহাসের প্রতি উদাসীনতার প্রতিচ্ছবি
দিনাজপুরে অবহেলিত শহীদ আসাদুল্লাহর সমাধি

দিনাজপুরে অবহেলিত শহীদ আসাদুল্লাহর সমাধি: ইতিহাসের প্রতি উদাসীনতার প্রতিচ্ছবি

দিনাজপুর শহরের মুন্সীপাড়ায় একটি ছোট দেয়ালে হোঁচট খেয়ে প্রায় পড়ে যাওয়ার পর তাকিয়ে দেখা যায়, সেটি একটি কবর। কবরের স্মৃতিফলকে লেখা রয়েছে ‘আবু আহমেদ আসাদুল্লাহ ১৯৬৯ গণ–অভ্যুত্থানে ২১/১/৬৯ ঢাকায় গুলিবিদ্ধ, স্বাধীনতাযুদ্ধে গুলিতে ১৪/৪/৭১ শহীদ হন।’ এই সমাধিটি দিনাজপুর জিলা স্কুলের প্রধান ফটকসংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত, যেখানে প্রতিদিন হাজারো মানুষ হাঁটাচলা করেন, কিন্তু শহীদ আসাদুল্লাহর স্মৃতি আজও অনেকের কাছেই অজানা।

ইতিহাসের অন্ধকারে ঢাকা একটি নাম

আসাদুল্লাহর বাড়ি ছিল মুন্সীপাড়ায়, যা চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানের সময় মাটির সঙ্গে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। স্থানীয়রা ব্যাখ্যা দেন যে, রহিম ভ্রাতৃদ্বয়ের (সাবেক বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও সাবেক সংসদ সদস্য ইকবালুর রহিম) বাড়িতে আগুন দেওয়ার সময় পাশাপাশি অবস্থিত আসাদুল্লাহদের বাড়িও ধ্বংস হয়ে যায়। এখানে একটি গুরুতর প্রশ্ন উঠে: যারা আগুন দিতে এসেছিল, তারা কারা? আসাদুল্লাহর কথা কি তারা জানত না? নাকি এটি আমাদের ইতিহাস রক্ষা না করার উদাসীনতার টাটকা অথবা বাসি ফল? কিংবা একটি শাস্তি?

ফেসবুকে আসাদুল্লাহর কবরের ছবি পোস্ট করার পর অনেকেই স্মৃতি শেয়ার করেন। কেউ লেখেন, ‘শহীদ আসাদুল্লাহ আমার বন্ধুর বড় ভাই। ১৯৭১ সালে উনি শহীদ হন। আল্লাহ তাঁকে বেহেশত নসিব করুন।’ আবার কেউ জানান, আসাদুল্লাহ তাঁর ‘মামার দিকের আত্মীয়’। সহপাঠীদের অনেকেই এখনো জীবিত নামজাদা মানুষজন, যারা হাত তুলে বলেছেন ‘আমি চিনি’, কিন্তু কেন তাঁরা এই ইতিহাসকে সামনে আনলেন না? আসাদুল্লাহ আসবেন না এই প্রশ্নের জবাব চাইতে; কিন্তু আমরা কি জবাবদিহি এড়াতে পারব?

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান ও আসাদুল্লাহর ভূমিকা

১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আসাদের মৃত্যু প্রবল স্রোত তোলে। আসাদের পুরো নাম আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান, যিনি ২০ জানুয়ারি পাকিস্তানি সামরিক শাসক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে সংঘটিত আন্দোলনে শহীদ হন। পরদিন, ২১ জানুয়ারি, আধা সামরিক বাহিনী ইপিআর বা ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের গুলিতে গুরুতর আহত হন বুয়েটের ছাত্র আরেক আসাদ, যিনি দিনাজপুরে রাস্তার পাশে কবরে শুয়ে থাকা আবু আহমেদ আসাদুল্লাহ।

ইপিআরের পায়ের কাছে পড়ে থাকা আসাদুল্লাহর পানির জন্য চিৎকারের ছবি পরের দিনের পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল, যা সারা দেশের মানুষকে আরও প্রতিবাদী করে তোলে। এই ছবি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জাদুঘরে এখনো অযত্নে রাখা আছে, এবং খবর পাওয়ার পর ছবিটির হদিস করতে প্রায় দুই সপ্তাহ লেগে যায়। নতুন বন্দোবস্তে সবকিছুর তাল যেন কেটে গেছে!

চিকিৎসা ও বিদেশে পাঠানো

উনসত্তরে আসাদুল্লাহ হাসপাতালে অন্যায্য চিকিৎসায় কাতরানোর সময় বিদ্রোহের আগুন তেতে ওঠে। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের হাতে খুন হন ড. সৈয়দ মোহাম্মদ শামসুজ্জোহা, যিনি সম্ভবত দেশের প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক। এরপর বিদ্রোহের আগুন ক্রমে ঘৃণায় রূপ নিতে থাকে, এবং মুসলিম লীগ ও আইয়ুবপন্থী প্রতিনিধিদের অফিস ও বাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটতে থাকে।

আসাদুল্লাহর একটা পা পচতে শুরু করে, যা পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের অবজ্ঞা–অবহেলার প্রতীক হয়ে ওঠে। পা কেটে ফেলতে হয়, এবং স্পাইনাল কর্ডও আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তৎকালীন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও মাওলানা ভাসানীর চাপে ইয়াহিয়ার আমলে বুয়েট কর্তৃপক্ষ ও পূর্ব পাকিস্তান সরকার তাঁকে চিকিৎসার জন্য ইংল্যান্ডে পাঠায়। দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে তিনি হুইলচেয়ারে ফেরত আসেন, এবং কয়েক মাস পরই অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়।

১৯৭১ সালে শহীদ হওয়া

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে আসাদুল্লাহর বাড়ির সবাই এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে গ্রামের বাড়িতে আশ্রয় নেন, কিন্তু আসাদুল্লাহ বাড়িতে থেকে যান। হয়তো তিনি ভেবেছিলেন, হুইলচেয়ারে থাকা একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী অসহায় মানুষকে কে আর খুন করবে। দিনাজপুর জেলা ও শহর ২৬ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল সকাল পর্যন্ত বাঙালি ইপিআর, পুলিশ ও মুক্তিকামী ছাত্র–জনতার দখলে ছিল।

এপ্রিলের ১৪ তারিখে সৈয়দপুর সেনানিবাস থেকে পাঞ্জাব রেজিমেন্টের সঙ্গে তরবারি, বল্লম, রামদাসহ উন্মত্ত কয়েক শ সিভিলিয়ান অবাঙালি দিনাজপুর-সৈয়দপুর সড়ক ধরে আর্টিলারি সেলের ছত্রচ্ছায়ায় দিনাজপুর শহরে ধীরে ধীরে এগোতে থাকে। পাকিস্তানিদের তীব্র হামলায় টিকতে না পেরে শহর থেকে মানুষজন পালাতে থাকে, এবং নারী-শিশুরা কয়েক দিন আগেই ভারত সীমান্তের কাছের গ্রামগুলোতে আশ্রয় নিয়েছিল।

একেবারে শেষ সময় যখন হানাদার বাহিনী ও উন্মত্ত অবাঙালিরা মাত্র কয়েক শ মিটার দূরে, তখন হুইলচেয়ারে আসাদুল্লাহ বাড়ি থেকে বেরিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে এগোতে থাকেন। প্রতিবন্ধিতার কারণে অন্যদের থেকে তিনি অনেক পেছনে পড়ে যান, এবং বাড়ি থেকে ১৫০–২০০ গজ দূরে জিলা স্কুলের ফটকের সামনে অবাঙালিরা তাঁকে ধরে ফেলে। এরপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যার পর তাঁকে ফেলে রাখে। কয়েক দিন পর শহর পরিষ্কারে নামা পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা তাঁকে রাস্তার পাশেই মাটিচাপা দেন। স্বাধীনতার পর পাড়ার তরুণেরা তাঁর কবরটি বাঁধানোর উদ্যোগ নেন, কিন্তু আজও এটি পুরোপুরি সংরক্ষিত হয়নি।

উপসংহার: ইতিহাস সংরক্ষণের দায়িত্ব

আসাদুল্লাহর এক সহপাঠী লেখককে লিখেছেন, ‘…যে দিনাজপুর জিলা স্কুলের সামনে দিয়ে আমরা একসময় স্কুলে যেতাম, ঠিক সেখানেই সে শহীদ হয়। সেখানেই তাকে দাফন করা হয়।’ উনসত্তরে গুলি খেয়ে বেঁচে যাওয়া গণ–অভ্যুথানের সামনের সারির কর্মী আর একাত্তরের শহীদ আবু আহম্মদ আসাদুল্লাহর রাস্তার পাশের কবরটি এখনো পুরোপুরি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়নি। এটি আমাদের ইতিহাসের প্রতি উদাসীনতার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। আমরা কবে শিখব আমাদের বীরদের মর্যাদা দিতে, তাঁদের মনে রাখতে, এবং ইতিহাস সঠিকভাবে লিখতে? এই প্রশ্ন আজও সমাজের কাছে উত্থাপিত।